ঢাকা ০৮:৪৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
‘কমিটিতে শিক্ষক নিয়োগ আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে পারে’—উদ্বেগ সংশ্লিষ্টদের বরিশালে বিয়ের দাওয়াতকে কেন্দ্র করে হামলা, আহত ৩ বরিশালের ভাসমান পেয়ারার হাট, রপ্তানির সম্ভাবনাঃ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ‘ডন’ গ্রেপ্তার, সালমান শাহ হত্যা মামলার আসামি শরণখোলায় হামিম পরিবহনের ধাক্কায় নিহত ১,আহত-৪ খুলনায় ঘর কেড়ে নিয়েছে নদী,স্বপ্ন কেড়ে নিচ্ছে শহর খুলনায় র‌্যাবের অভিযানে বিপুল ইয়াবা উদ্ধার,গ্রেপ্তার-৪ ইয়াবাসহ আটকের পর ছাত্রদলের দুই নেতা বহিষ্কার সাপে কামড়ের পর অ্যান্টিভেনম না দিয়ে রেফার, পথে অ্যাম্বুলেন্সে মৃত্যু  সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে লড়াই, ঘরভাড়া দিতে চুল বিক্রি করলেন রেহানা

লালমনিরহাটে উন্নয়নের ছোঁয়ায় বদলে গেছে দৃশ্য-পট!

সারা দেশের ন্যায় লালমনিরহাট জেলাও সফল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র প্রচেষ্টায় উন্নয়নের ছোঁয়ায় পাল্টে গেছে। সবখানে উন্নয়নের দৃশ্যমান ছোঁয়া লেগেছে। জেলা জুড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থায় যাহা আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে। এই জেলা এক সময় দেশে বিদেশে শিক্ষা নগরী হিসেবে সুখ্যাতি অর্জনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। খুব শীঘ্র্রই ব্যবসা-বাণিজ্যে ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার স্বর্ণদ্বারে পরিণত হতে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের আমলে ৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির আলোকে ১১১টি ভারতীয় ছিটমহলের ভূ-খন্ড হয়ে গেছে এ দেশের সম্পদ। সুবিধাবঞ্চিত এসব বিলুপ্ত ছিটমহলবাসী এখন সমৃদ্ধি অর্জনের পথে। জেলার এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকলে এ জেলা শুধু নয়, সারাবিশ্বে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ, শিক্ষা সমৃদ্ধ, যোগাযোগ সমৃদ্ধ, পর্যটন সমৃদ্ধ, শিল্প কলকারখানা সমৃদ্ধ দেশের প্রথম ধাপের অর্থনৈতিক সূচকের জেলা হিসেবে মাথা উঁচু করে থাকবে। ঘুচে যাবে দরিদ্র্রপীড়িত মঙ্গার জেলার কলঙ্কিত অধ্যায়ের।

উত্তরের এ জেলা এক সময় অবিভক্ত ভারতবর্ষে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য একটি সমৃদ্ধ হিসেবে সুখ্যাতি ছিল। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের কারণে এই জেলা ছিল দক্ষিণ এশিয়ার স্বর্ণদ্বারখ্যাত। এই জেলা হতে রেলপথে ট্রেনে চেপে সুদূর করাচি, কুচবিহার, দার্জিলিং যাওয়া যেত। ভারতবর্ষের সঙ্গে রেলপথ, নৌপথ ও সড়কপথে যোগাযোগ ছিল। সেই সময় এ জেলায় ছিল বেশ ক’য়টি বৃহৎ শিল্প কলকারখানা, সাবান তৈরি কারখানা, সয়াবিন তৈল পরিশোধনাগার, বিশাল অত্যাধুনিক অটোমিশন রাইস মিল, ছোট বড় শিল্প কলকারখানা, স্বর্ণ আশখ্যাত পাটের ব্যবসা, রেলওয়ে কারখানা, রেলওয়ের ৫০ মেগা ওয়ার্ডে কুইক রেন্টাল পাওয়ার হাউস। এই জেলা হতে ভারতবর্ষে ও উত্তরের জেলাগুলোতে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালিত হত। এখানে ভারতবর্ষের প্রথম ঘুরর্ণিয় মান মঞ্চ ১০টি দৃশ্যের নিয়ে আধুনিক সিনেমা হল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যাহা রেলওয়ে এমটি হোসেন ইনিস্টিটিউট নামে পরিচিত। সেই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ আধুনিক বিমানবন্দর ও ঘাঁটি ১৭৬০ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ভৌগলিক গুরুত্ব অনুধাবন করে ব্রিটিশ সরকার এখানে বিমানবন্দর ও ঘাঁটি নির্মাণ করেছিল।

১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই জেলার উন্নয়নে মনোনিবেশ করেন। তিনি সদ্য স্বাধীন দেশের বিমানবাহিনীর ঘাঁটি এ জেলায় চালু করেছিলেন। তার ইচ্ছে ছিল এখানে বিমান বাহিনীর প্রধান কার্যালয় স্থাপন করবেন। থাকবে আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও সামরিক ঘাঁটি। জেলা তিস্তা নদীতে কাকিনায় বৃহত্তর সেচ প্রকল্প গ্রহণ করেছিলেন। এই অঞ্চলের নদী পথগুলোকে চালু করতে চেয়েছিলেন। কলকারখানাগুলো চালু করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
১৯৯৬ সালে প্রথম ২১ বছর পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসে। সেই সময় উত্তরের এই জেলায় উন্নয়নের বীজবপন হয়। শেখ হাসিনা তিস্তা নদীর ওপর সেতু নির্মাণে ভিত্তি স্থাপন করেন। কিন্তু সেই উন্নয়ন স্থায়ীরুপ নিতে পারেনি। মিথ্যা প্রপাগান্ডা ও স্থুল কারচুপির মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হয়ে যায়। পুনরায় ২০০৮ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসে। তাই ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। শেখ হাসিনার সরকারের আমলে প্রায় দেড়শত কিঃমিঃ রেলপথ ও প্রায় ১৩-১৪টি রেলওয়ে স্টেশন কাউনিয়া টু লালমনিরহাট টু পাটগ্রাম রেললাইন পুর্নসংস্হাপন ও সংস্কার করা হয়েছে। প্রতিটি রেলস্টেশন রিমডেলিং করা হয়েছে।

২০১৯ সালে দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র সিভিল এ্যাভিয়েশন বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সিভিল এ্যাভিয়েশন বিশ্ববিদ্যালয় চালু হয়েছে।
এখানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সাড়ে ৭শত একর জমির ওপর ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি ব্যাচ শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে ঢাকা ক্যাম্পাসে। তিস্তা নদীর ওপর তিস্তা শেখ হাসিনা সড়ক সেতু কাউনিয়া ও শেখ হাসিনা দ্বিতীয় সড়ক সেতু মহিপুর নির্মাণ করা হয়েছে। এতে করে রংপুরের সঙ্গে এই জেলার দূরত্ব প্রায় ১২ কিঃ মিঃ কমে এসেছে। এই জেলার কুলাঘাটে ধরলা নদীর ওপর শেখ হাসিনা দ্বিতীয় সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। এতে জেলার সঙ্গে কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ি, নাগেশ্বরীর সড়কপথে যোগাযোগ স্থাপন হয়েছে। নদী দিয়ে বিচ্ছিন্ন উপজেলা দুটি সড়কপথে সংযোগ তৈরি হয়েছে। একশত শয্যার আধুনিক হাসপাতালটিকে আড়াইশত শয্যায় উন্নীতকরণ করা হয়েছে। নির্মাণ হয়েছে ৮নতলা আধুনিক ভবন। জেলা সরকারী নার্সি ইনস্টিটিউট চালু হয়েছে, লালমনিরহাট সরকারী কলেজে একাধিক বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু হয়েছে, সরকারী কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বুড়িমারী স্থলবন্দর আধুনিকরণ, বুড়িমারী স্থলবন্দরে ই-ম্যানেজমেন্ট চালু হয়েছে, পার্সপোট অফিস চালু, আধুনিক সার্কিট হাউস সম্প্রসারণ হয়েছে, কালীগঞ্জে বিশেষায়িত এক শ’ শয্যার মা ও শিশু হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছে, লালমনিরহাট হতে সরাসরি ঢাকা আধুনিক নতুন ইন্টারসিটি নতুন কোচে ট্রেন চালু করা হয়েছে, পুলিশ লাইনে নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, জেলার প্রতিটি থানায় ওসি সাহেবদের নতুন পিকআপ ও টহল ভ্যান দেয়া হয়েছে,

প্রায় প্রতিটি সরকারী বেসরকারী বিদ্যালয়ে সরকারীভাবে একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, নতুন পুরানো সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নতুন শিশু ও শিক্ষাবান্ধব একাডেমি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, এই জেলায় ঢাকা হতে সেনাবাহিনীর সামরিক পাইলট ট্রেনিং স্কুল ও সেন্টারটি লালমনিরহাটে হস্থান্তর করা হয়েছে, এখানে ২২ মিলিটারি ব্রিগেডের অধীনে শিক্ষা পল্লীর কার্যক্রম চালু হয়েছে, এই জেলায় নতুন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল এ্যান্ড কলেজ চালু হয়েছে। বিমানবাহিনীর পরিত্যক্ত রানওয়ে সংস্কার করে বিমানবাহিনীর ট্রেনিং সেন্টারের জন্য ব্যবহার উপযোগী করা হয়েছে। বিমানবাহিনী ও আর্মি ট্রেনিং সেন্টার চালু করা হয়েছে। পিপিআই প্রজেক্টের অধীনে ডায়াবেটিক এক শ’ শয্যার আধুনিক হাসপাতালের নতুন ভবন নির্মাণ ও হাসপাতাল চালু করা হয়েছে। সেখানে স্বল্পখরচে জেলার সাধারণ মানুষ চিকিৎসা সেবা নিতে পারে।

জেলায় তিস্তা নদী খনন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে ব্যয় হবে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা। একনেকে পাস হয়েছে। এই জেলায় বুড়িমারী স্থল বন্দর হতে রংপুরের পায়রা বন্দর পর্যন্ত প্রায় ৬৫ কিলোমিটার আধুনিক স্পেসওয়ে মহাসড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বুড়িমারী হতে লালমনিরহাট শহর হয়ে ঢাকা ৮ লেন আন্তর্জাতিক মহাসড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ঢাকা টু রংপুর পর্যন্ত কাজ শুরু হয়েছে। এদিকে পর্যায়ক্রমে এ কাজ খুব শীঘ্রই শুরু হবে। সেনাবাহিনীর ২২ শিক্ষা ব্রিগেডের অধীনে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়াও সরকারীভাবে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মহেন্দ্রনগরে একটি ইপিজেড নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জেলার আদিতমারী অথবা কালীগঞ্জে সরকারীভাবে একটি পলিটেকনিক কলেজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। হাতীবান্ধা এই জেলার ব্যান্ডিং ফসল ভুট্টা পোসেসিং কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অন্যান্য অগ্রাধিকার কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে মানসম্মত শিক্ষার প্রসার ও বিকাশ সাধন করে মানব সম্পদের উন্নয়ন, জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেয়া ও দুর্নীতি প্রতিরোধ। তাছাড়া বৈশ্বিক আবহাওয়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনী বৃদ্ধি, বন্যা বাঁধ ও সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন, পরিবার কল্যাণ সাধন, স্বাস্থ্য ও প্রজনন সেবা প্রদান, দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ সাধন, শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিসৌধ নির্মাণ, দেশজ সংস্কৃতি বিকাশ, যুব ও ক্রীড়া উন্নয়ন, রেলওয়ে অবকাঠামো নির্মাণ ও সংস্কার, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন শিল্পের বিকাশ, নারীর ক্ষমতায়ন ও শিশু কল্যাণ ইত্যাদি। বিভাগীয় প্রশাসন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইভটিজিং প্রতিরোধসহ বিভিন্ন অপরাধসমূহ প্রতিরোধে মোবাইল কোর্টসমূহ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

লাখো মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্নের তিস্তা সেতুর উদ্বোধন হয় ২০ সেপ্টেম্বর ২০১২ সালে। উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণ হয় লাখো মানুষের স্বপ্ন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে রংপুর, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম অঞ্চলের মানুষের উন্নয়নের পথ খুলে দিয়েছেন। ঘুড়িয়ে দেন অত্র অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের চাকা। তিস্তা সড়ক সেতুটি নির্মাণ হওয়ায় রংপুর- ঢাকসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে লালমনিরহাট এবং কুড়িগ্রাম জেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। এছাড়া এ পথে পাটগ্রামের বুড়িমারী সীমান্ত হয়ে ভারত, নেপাল, ভুটান যাতায়াতকারী ব্যবসায়ী, যাত্রী এবং পর্যটকদের বিড়ম্বনা লাঘব হয়েছে। পাশাপাশি তিস্তা রেলসেতু অনেকটাই ঝুঁকিমুক্ত হয়েছে এবং এ পথে যানবাহন চলাচলে থাকছে না কোন প্রতিবন্ধকতা। লালমনিরহাট জেলার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে এই তিস্তা সড়ক সেতুটি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post
Classic Software Technology

‘কমিটিতে শিক্ষক নিয়োগ আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে পারে’—উদ্বেগ সংশ্লিষ্টদের

লালমনিরহাটে উন্নয়নের ছোঁয়ায় বদলে গেছে দৃশ্য-পট!

Update Time : ০২:০৫:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ এপ্রিল ২০২৩

সারা দেশের ন্যায় লালমনিরহাট জেলাও সফল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র প্রচেষ্টায় উন্নয়নের ছোঁয়ায় পাল্টে গেছে। সবখানে উন্নয়নের দৃশ্যমান ছোঁয়া লেগেছে। জেলা জুড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থায় যাহা আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে। এই জেলা এক সময় দেশে বিদেশে শিক্ষা নগরী হিসেবে সুখ্যাতি অর্জনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। খুব শীঘ্র্রই ব্যবসা-বাণিজ্যে ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার স্বর্ণদ্বারে পরিণত হতে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের আমলে ৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির আলোকে ১১১টি ভারতীয় ছিটমহলের ভূ-খন্ড হয়ে গেছে এ দেশের সম্পদ। সুবিধাবঞ্চিত এসব বিলুপ্ত ছিটমহলবাসী এখন সমৃদ্ধি অর্জনের পথে। জেলার এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকলে এ জেলা শুধু নয়, সারাবিশ্বে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ, শিক্ষা সমৃদ্ধ, যোগাযোগ সমৃদ্ধ, পর্যটন সমৃদ্ধ, শিল্প কলকারখানা সমৃদ্ধ দেশের প্রথম ধাপের অর্থনৈতিক সূচকের জেলা হিসেবে মাথা উঁচু করে থাকবে। ঘুচে যাবে দরিদ্র্রপীড়িত মঙ্গার জেলার কলঙ্কিত অধ্যায়ের।

উত্তরের এ জেলা এক সময় অবিভক্ত ভারতবর্ষে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য একটি সমৃদ্ধ হিসেবে সুখ্যাতি ছিল। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের কারণে এই জেলা ছিল দক্ষিণ এশিয়ার স্বর্ণদ্বারখ্যাত। এই জেলা হতে রেলপথে ট্রেনে চেপে সুদূর করাচি, কুচবিহার, দার্জিলিং যাওয়া যেত। ভারতবর্ষের সঙ্গে রেলপথ, নৌপথ ও সড়কপথে যোগাযোগ ছিল। সেই সময় এ জেলায় ছিল বেশ ক’য়টি বৃহৎ শিল্প কলকারখানা, সাবান তৈরি কারখানা, সয়াবিন তৈল পরিশোধনাগার, বিশাল অত্যাধুনিক অটোমিশন রাইস মিল, ছোট বড় শিল্প কলকারখানা, স্বর্ণ আশখ্যাত পাটের ব্যবসা, রেলওয়ে কারখানা, রেলওয়ের ৫০ মেগা ওয়ার্ডে কুইক রেন্টাল পাওয়ার হাউস। এই জেলা হতে ভারতবর্ষে ও উত্তরের জেলাগুলোতে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালিত হত। এখানে ভারতবর্ষের প্রথম ঘুরর্ণিয় মান মঞ্চ ১০টি দৃশ্যের নিয়ে আধুনিক সিনেমা হল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যাহা রেলওয়ে এমটি হোসেন ইনিস্টিটিউট নামে পরিচিত। সেই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ আধুনিক বিমানবন্দর ও ঘাঁটি ১৭৬০ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ভৌগলিক গুরুত্ব অনুধাবন করে ব্রিটিশ সরকার এখানে বিমানবন্দর ও ঘাঁটি নির্মাণ করেছিল।

১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই জেলার উন্নয়নে মনোনিবেশ করেন। তিনি সদ্য স্বাধীন দেশের বিমানবাহিনীর ঘাঁটি এ জেলায় চালু করেছিলেন। তার ইচ্ছে ছিল এখানে বিমান বাহিনীর প্রধান কার্যালয় স্থাপন করবেন। থাকবে আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও সামরিক ঘাঁটি। জেলা তিস্তা নদীতে কাকিনায় বৃহত্তর সেচ প্রকল্প গ্রহণ করেছিলেন। এই অঞ্চলের নদী পথগুলোকে চালু করতে চেয়েছিলেন। কলকারখানাগুলো চালু করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
১৯৯৬ সালে প্রথম ২১ বছর পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসে। সেই সময় উত্তরের এই জেলায় উন্নয়নের বীজবপন হয়। শেখ হাসিনা তিস্তা নদীর ওপর সেতু নির্মাণে ভিত্তি স্থাপন করেন। কিন্তু সেই উন্নয়ন স্থায়ীরুপ নিতে পারেনি। মিথ্যা প্রপাগান্ডা ও স্থুল কারচুপির মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হয়ে যায়। পুনরায় ২০০৮ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসে। তাই ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। শেখ হাসিনার সরকারের আমলে প্রায় দেড়শত কিঃমিঃ রেলপথ ও প্রায় ১৩-১৪টি রেলওয়ে স্টেশন কাউনিয়া টু লালমনিরহাট টু পাটগ্রাম রেললাইন পুর্নসংস্হাপন ও সংস্কার করা হয়েছে। প্রতিটি রেলস্টেশন রিমডেলিং করা হয়েছে।

২০১৯ সালে দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র সিভিল এ্যাভিয়েশন বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সিভিল এ্যাভিয়েশন বিশ্ববিদ্যালয় চালু হয়েছে।
এখানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সাড়ে ৭শত একর জমির ওপর ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি ব্যাচ শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে ঢাকা ক্যাম্পাসে। তিস্তা নদীর ওপর তিস্তা শেখ হাসিনা সড়ক সেতু কাউনিয়া ও শেখ হাসিনা দ্বিতীয় সড়ক সেতু মহিপুর নির্মাণ করা হয়েছে। এতে করে রংপুরের সঙ্গে এই জেলার দূরত্ব প্রায় ১২ কিঃ মিঃ কমে এসেছে। এই জেলার কুলাঘাটে ধরলা নদীর ওপর শেখ হাসিনা দ্বিতীয় সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। এতে জেলার সঙ্গে কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ি, নাগেশ্বরীর সড়কপথে যোগাযোগ স্থাপন হয়েছে। নদী দিয়ে বিচ্ছিন্ন উপজেলা দুটি সড়কপথে সংযোগ তৈরি হয়েছে। একশত শয্যার আধুনিক হাসপাতালটিকে আড়াইশত শয্যায় উন্নীতকরণ করা হয়েছে। নির্মাণ হয়েছে ৮নতলা আধুনিক ভবন। জেলা সরকারী নার্সি ইনস্টিটিউট চালু হয়েছে, লালমনিরহাট সরকারী কলেজে একাধিক বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু হয়েছে, সরকারী কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বুড়িমারী স্থলবন্দর আধুনিকরণ, বুড়িমারী স্থলবন্দরে ই-ম্যানেজমেন্ট চালু হয়েছে, পার্সপোট অফিস চালু, আধুনিক সার্কিট হাউস সম্প্রসারণ হয়েছে, কালীগঞ্জে বিশেষায়িত এক শ’ শয্যার মা ও শিশু হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছে, লালমনিরহাট হতে সরাসরি ঢাকা আধুনিক নতুন ইন্টারসিটি নতুন কোচে ট্রেন চালু করা হয়েছে, পুলিশ লাইনে নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, জেলার প্রতিটি থানায় ওসি সাহেবদের নতুন পিকআপ ও টহল ভ্যান দেয়া হয়েছে,

প্রায় প্রতিটি সরকারী বেসরকারী বিদ্যালয়ে সরকারীভাবে একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, নতুন পুরানো সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নতুন শিশু ও শিক্ষাবান্ধব একাডেমি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, এই জেলায় ঢাকা হতে সেনাবাহিনীর সামরিক পাইলট ট্রেনিং স্কুল ও সেন্টারটি লালমনিরহাটে হস্থান্তর করা হয়েছে, এখানে ২২ মিলিটারি ব্রিগেডের অধীনে শিক্ষা পল্লীর কার্যক্রম চালু হয়েছে, এই জেলায় নতুন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল এ্যান্ড কলেজ চালু হয়েছে। বিমানবাহিনীর পরিত্যক্ত রানওয়ে সংস্কার করে বিমানবাহিনীর ট্রেনিং সেন্টারের জন্য ব্যবহার উপযোগী করা হয়েছে। বিমানবাহিনী ও আর্মি ট্রেনিং সেন্টার চালু করা হয়েছে। পিপিআই প্রজেক্টের অধীনে ডায়াবেটিক এক শ’ শয্যার আধুনিক হাসপাতালের নতুন ভবন নির্মাণ ও হাসপাতাল চালু করা হয়েছে। সেখানে স্বল্পখরচে জেলার সাধারণ মানুষ চিকিৎসা সেবা নিতে পারে।

জেলায় তিস্তা নদী খনন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে ব্যয় হবে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা। একনেকে পাস হয়েছে। এই জেলায় বুড়িমারী স্থল বন্দর হতে রংপুরের পায়রা বন্দর পর্যন্ত প্রায় ৬৫ কিলোমিটার আধুনিক স্পেসওয়ে মহাসড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বুড়িমারী হতে লালমনিরহাট শহর হয়ে ঢাকা ৮ লেন আন্তর্জাতিক মহাসড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ঢাকা টু রংপুর পর্যন্ত কাজ শুরু হয়েছে। এদিকে পর্যায়ক্রমে এ কাজ খুব শীঘ্রই শুরু হবে। সেনাবাহিনীর ২২ শিক্ষা ব্রিগেডের অধীনে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়াও সরকারীভাবে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মহেন্দ্রনগরে একটি ইপিজেড নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জেলার আদিতমারী অথবা কালীগঞ্জে সরকারীভাবে একটি পলিটেকনিক কলেজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। হাতীবান্ধা এই জেলার ব্যান্ডিং ফসল ভুট্টা পোসেসিং কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অন্যান্য অগ্রাধিকার কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে মানসম্মত শিক্ষার প্রসার ও বিকাশ সাধন করে মানব সম্পদের উন্নয়ন, জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেয়া ও দুর্নীতি প্রতিরোধ। তাছাড়া বৈশ্বিক আবহাওয়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনী বৃদ্ধি, বন্যা বাঁধ ও সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন, পরিবার কল্যাণ সাধন, স্বাস্থ্য ও প্রজনন সেবা প্রদান, দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ সাধন, শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিসৌধ নির্মাণ, দেশজ সংস্কৃতি বিকাশ, যুব ও ক্রীড়া উন্নয়ন, রেলওয়ে অবকাঠামো নির্মাণ ও সংস্কার, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন শিল্পের বিকাশ, নারীর ক্ষমতায়ন ও শিশু কল্যাণ ইত্যাদি। বিভাগীয় প্রশাসন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইভটিজিং প্রতিরোধসহ বিভিন্ন অপরাধসমূহ প্রতিরোধে মোবাইল কোর্টসমূহ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

লাখো মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্নের তিস্তা সেতুর উদ্বোধন হয় ২০ সেপ্টেম্বর ২০১২ সালে। উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণ হয় লাখো মানুষের স্বপ্ন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে রংপুর, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম অঞ্চলের মানুষের উন্নয়নের পথ খুলে দিয়েছেন। ঘুড়িয়ে দেন অত্র অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের চাকা। তিস্তা সড়ক সেতুটি নির্মাণ হওয়ায় রংপুর- ঢাকসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে লালমনিরহাট এবং কুড়িগ্রাম জেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। এছাড়া এ পথে পাটগ্রামের বুড়িমারী সীমান্ত হয়ে ভারত, নেপাল, ভুটান যাতায়াতকারী ব্যবসায়ী, যাত্রী এবং পর্যটকদের বিড়ম্বনা লাঘব হয়েছে। পাশাপাশি তিস্তা রেলসেতু অনেকটাই ঝুঁকিমুক্ত হয়েছে এবং এ পথে যানবাহন চলাচলে থাকছে না কোন প্রতিবন্ধকতা। লালমনিরহাট জেলার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে এই তিস্তা সড়ক সেতুটি।

প্রিন্ট করুন :