ঢাকা ০৩:২০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :

পীরগঞ্জ: দ্বন্দ্ব আর দ্বৈততার প্যাচে বন্দি এক জনপদ

সাকিব আহসান, প্রতিনিধি, পীরগঞ্জ (ঠাকুরগাঁও)

ঠাকুরগাঁওয়ের প্রান্তে এক চুপচাপ জনপদ—পীরগঞ্জ। তবে নীরবতা মানেই স্থিরতা নয়। এখানে সমাজ বদলাচ্ছে, ধর্মের ব্যাখ্যা পাল্টাচ্ছে, সংস্কৃতির মাটি ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে পায়ের তলা থেকে। হরিশংকর জলদাসের “রামগোলাম”-এর চরিত্রেরা যেন বাস্তব হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এই জনপদের প্রতিটি কোণে।

গ্রামের ভাঙাচোরা মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা আদিবাসী পরিবারগুলো এখনো অপেক্ষা করছে উন্নয়নের। কিছু বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) সহায়তা করলেও তা অপ্রতুল। রাষ্ট্রের কেন্দ্র থেকে বহু দূরের এই জনপদ যেন উন্নয়ন নামক ট্রেনের শেষ স্টপেজেও ঠাঁই পায়নি।

পীরগঞ্জের বাতাসে এখন রাজনীতি আর পুঁজির অদৃশ্য যোগসাজশের গন্ধ। রাজনীতি দুর্বল হলে ক্ষমতাধরদের পেছনে থাকা ব্যবসায়ী গোষ্ঠী সামলে নেয় হাল। বাজারদর, উন্নয়ন, এমনকি শান্তিও নির্ভর করে এই ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’-এর ইচ্ছেমতো। ফলে ব্যথাটা গিয়ে পড়ে মধ্যবিত্তের বুকেই।

শহরের দিকে ছুটছে পীরগঞ্জের নতুন প্রজন্ম। চাকরি না পেয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরা ভেঙে পড়ছে হতাশায়। কেউ আশ্রয় নিচ্ছে নেশার বৃত্তে, কেউ আবার মাথা উঁচু রাখছে পৈতৃক সম্পত্তির উপর দাঁড়িয়ে। এর মাঝে তৈরি হচ্ছে গভীর শ্রেণিবৈষম্য—একটা অংশ টিকে থাকার লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছে, অন্য অংশ নিঃশব্দে উৎসবে মেতে উঠছে।

এ দৃশ্যপটে নতুন সংযোজন ধর্মের মোড়কে সমাজ নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা। একের পর এক গড়ে উঠছে ধার্মিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে প্রায়শ্চিত্তের ছদ্মবেশে চলছে সামাজিক মোড়লগিরি। নীতি-নৈতিকতার বুলি কেবল মঞ্চে বা মানববন্ধনের ব্যানারে সীমাবদ্ধ। বাস্তবে, সমাজ কাঠামোকে ঘুণে খেয়ে ফেলছে নিঃশব্দে।

একদিকে বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, অন্যদিকে ধর্মীয় ও সামাজিক দখলদারিত্বের তীব্রতা—সব মিলিয়ে পীরগঞ্জ আজ এক দ্বৈত বাস্তবতার নাম। এখানে নগরায়নের ঢেউ এসে লাগলেও তার ঢেউ কখনোই ভিজিয়ে দেয় না মানুষের কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ।

একটা প্রশ্ন থেকেই যায়—এই সমাজ, এই জনপদ, এই মানুষগুলো কি আদৌ পৌঁছাবে সেই আলোর ঠিকানায়, না কি ‘উন্নয়ন’ নামের ব্যানারে তারা হারিয়ে যাবে বিস্মৃতির গলিতে?


 

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Md. Riajul Islam

Popular Post

পীরগঞ্জ: দ্বন্দ্ব আর দ্বৈততার প্যাচে বন্দি এক জনপদ

Update Time : ১০:৪১:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ মে ২০২৫

সাকিব আহসান, প্রতিনিধি, পীরগঞ্জ (ঠাকুরগাঁও)

ঠাকুরগাঁওয়ের প্রান্তে এক চুপচাপ জনপদ—পীরগঞ্জ। তবে নীরবতা মানেই স্থিরতা নয়। এখানে সমাজ বদলাচ্ছে, ধর্মের ব্যাখ্যা পাল্টাচ্ছে, সংস্কৃতির মাটি ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে পায়ের তলা থেকে। হরিশংকর জলদাসের “রামগোলাম”-এর চরিত্রেরা যেন বাস্তব হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এই জনপদের প্রতিটি কোণে।

গ্রামের ভাঙাচোরা মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা আদিবাসী পরিবারগুলো এখনো অপেক্ষা করছে উন্নয়নের। কিছু বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) সহায়তা করলেও তা অপ্রতুল। রাষ্ট্রের কেন্দ্র থেকে বহু দূরের এই জনপদ যেন উন্নয়ন নামক ট্রেনের শেষ স্টপেজেও ঠাঁই পায়নি।

পীরগঞ্জের বাতাসে এখন রাজনীতি আর পুঁজির অদৃশ্য যোগসাজশের গন্ধ। রাজনীতি দুর্বল হলে ক্ষমতাধরদের পেছনে থাকা ব্যবসায়ী গোষ্ঠী সামলে নেয় হাল। বাজারদর, উন্নয়ন, এমনকি শান্তিও নির্ভর করে এই ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’-এর ইচ্ছেমতো। ফলে ব্যথাটা গিয়ে পড়ে মধ্যবিত্তের বুকেই।

শহরের দিকে ছুটছে পীরগঞ্জের নতুন প্রজন্ম। চাকরি না পেয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরা ভেঙে পড়ছে হতাশায়। কেউ আশ্রয় নিচ্ছে নেশার বৃত্তে, কেউ আবার মাথা উঁচু রাখছে পৈতৃক সম্পত্তির উপর দাঁড়িয়ে। এর মাঝে তৈরি হচ্ছে গভীর শ্রেণিবৈষম্য—একটা অংশ টিকে থাকার লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছে, অন্য অংশ নিঃশব্দে উৎসবে মেতে উঠছে।

এ দৃশ্যপটে নতুন সংযোজন ধর্মের মোড়কে সমাজ নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা। একের পর এক গড়ে উঠছে ধার্মিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে প্রায়শ্চিত্তের ছদ্মবেশে চলছে সামাজিক মোড়লগিরি। নীতি-নৈতিকতার বুলি কেবল মঞ্চে বা মানববন্ধনের ব্যানারে সীমাবদ্ধ। বাস্তবে, সমাজ কাঠামোকে ঘুণে খেয়ে ফেলছে নিঃশব্দে।

একদিকে বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, অন্যদিকে ধর্মীয় ও সামাজিক দখলদারিত্বের তীব্রতা—সব মিলিয়ে পীরগঞ্জ আজ এক দ্বৈত বাস্তবতার নাম। এখানে নগরায়নের ঢেউ এসে লাগলেও তার ঢেউ কখনোই ভিজিয়ে দেয় না মানুষের কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ।

একটা প্রশ্ন থেকেই যায়—এই সমাজ, এই জনপদ, এই মানুষগুলো কি আদৌ পৌঁছাবে সেই আলোর ঠিকানায়, না কি ‘উন্নয়ন’ নামের ব্যানারে তারা হারিয়ে যাবে বিস্মৃতির গলিতে?


 

প্রিন্ট করুন :