ময়মনসিংহ প্রতিনিধিঃ
সড়ক দুর্ঘটনায় দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। গুরুতর আহত হয়েছে ডান হাত ও বাম পা। তবু থেমে থাকেননি রুবিনা আক্তার। চোখে দেখতে না পেলেও সহপাঠীদের পাশে বসে শিক্ষকদের পাঠ শুনেছেন, চালিয়ে গেছেন পড়াশোনা। শ্রুতিলেখকের সহায়তায় পরীক্ষা দিয়ে ২০২৬ সালের এসএসসিতে ৩ দশমিক ০৬ জিপিএ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। এখন তাঁর স্বপ্ন—পড়াশোনা শেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া।
রুবিনা ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার আচারগাঁও ইউনিয়নের ধরগাঁও গ্রামের দিনমজুর রুবেল মিয়ার মেয়ে। তবে এসএসসি পাসের আনন্দের পাশাপাশি তাঁর পরিবারের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—অর্থের অভাবে কি থেমে যাবে রুবিনার উচ্চশিক্ষা?
পাঁচ সদস্যের সংসারের নিত্যদিনের খরচ চালাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে মেয়ের পড়াশোনার ব্যয় বহন করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পরিবারটি। রুবিনা অবশ্য থামতে চান না। সরকারি ও সমাজের মানুষের সহযোগিতা নিয়ে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চান তিনি।
দুর্ঘটনায় হারান দৃষ্টিশক্তি
২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট। তখন নবম শ্রেণির ছাত্রী রুবিনা সহপাঠীদের সঙ্গে ইজিবাইকে করে মুশুলী উচ্চ বিদ্যালয়ে যাচ্ছিলেন। ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ সড়কে দ্রুতগতির একটি বাস ইজিবাইকটিকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই দুজন নিহত হন। গুরুতর আহত রুবিনাকে উদ্ধার করে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
মেয়ের জীবন বাঁচাতে সহায়-সম্বল বিক্রি করে দীর্ঘদিন চিকিৎসা করান বাবা রুবেল মিয়া। প্রায় এক বছর চিকিৎসাধীন থাকার পর বাড়ি ফিরলেও রুবিনা হারান দৃষ্টিশক্তি। দুর্ঘটনায় তাঁর ডান হাত ও বাম পাও গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁকে পড়াশোনা থেকে দূরে রাখতে পারেনি। পরিবারের সদস্যদের রাজি করিয়ে আবার স্কুলে ফেরেন তিনি। চোখে দেখতে না পেলেও সহপাঠীদের পাশে বসে শিক্ষকদের পাঠ শুনে পড়াশোনা চালিয়ে যান। এসএসসি পরীক্ষার হলে একই বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী তাঁর শ্রুতিলেখক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
প্রথমবার একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হলেও দমে যাননি রুবিনা। দ্বিতীয়বার সেই বিষয়ে পরীক্ষা দিয়ে এবার সফল হয়েছেন তিনি।
‘আমি কি আরও পড়তে পারব?’
ফল প্রকাশের পর আবেগাপ্লুত রুবিনা আক্তার বলেন, ‘আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। মা-বাবা, সহপাঠী ও শিক্ষকদের ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু আমার মনে একটাই চিন্তা—আমি কি আরও পড়তে পারব? আমার দিনমজুর বাবার পক্ষে কি সেটা সম্ভব?’
তিনি বলেন, ‘সরকারিভাবে যদি সহযোগিতা পাই, তাহলে পড়াশোনা শেষ করে অন্তত একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চাই। আমার এই স্বপ্ন পূরণে সমাজের মানুষের সহযোগিতা চাই।’
রুবিনার মা রুমা আক্তার বলেন, ‘মেয়েটা পাস করেছে, সে পড়তে চায়। আমাদের ঘরের জায়গাটুকু ছাড়া আর কোনো সম্পদ নেই। পাঁচজনের সংসার কোনোভাবে চলে। আমার স্বামী স্থানীয় একটি বাজারে পুরি-সিঙ্গারা বিক্রি করেন। যা আয় করেন, তা দিয়েই সংসার চলে। মেয়ের পড়াশোনার খরচ কীভাবে জোগাড় করব?’
বাবা রুবেল মিয়া বলেন, ‘মেয়েটা দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার পর চিকিৎসার খরচ বহন করতে গিয়ে সহায়-সম্বল সব শেষ হয়ে গেছে। তখন অনেকেই সহযোগিতা করেছেন। এখন ১২ বছরের ছেলেকে নিয়ে পুরি-সিঙ্গারা বিক্রি করে কোনোভাবে সংসার চালাচ্ছি। মেয়ের পড়াশোনার খরচ কীভাবে জোগাড় করব, বুঝতে পারছি না।’
মুশুলী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মনিরুল আমিন রাসেল বলেন, ‘রুবিনা দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও পড়াশোনার প্রতি যে অদম্য আগ্রহ দেখিয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।’
নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা জান্নাত বলেন, ‘রুবিনার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে শিক্ষাবৃত্তির সহযোগিতা করা হবে।’
রুবিনার সামনে এখন তাই নতুন পথচলা। চোখের আলো হারিয়েও যে স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, সেই স্বপ্ন পূরণে তাঁর প্রয়োজন শুধু একটু সহযোগিতা।
মোঃ রিয়াজুল ইসলাম 






















