মো. আশরাফ, আগৈলঝাড়া (বরিশাল)
‘কায়দা রে কায়দা, ওরে কায়দা—কায়দার কায়দা বাক্সের ভেতর দুনিয়া আছে, দেইখ্যা যান মন ভইরা।’ এক হাতে ডুগডুগি, অন্য হাতে বায়োস্কোপের হ্যান্ডেল। ছন্দ মিলিয়ে এমন ডাকেই একসময় গ্রামের পথে পথে মানুষ জড়ো করতেন সর্বানন্দ মধু। পাঁচ দশক পরও থামেনি তাঁর সেই ডাক।
বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার বাগধা গ্রামের বাসিন্দা সর্বানন্দ মধু। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তাঁর বয়স ৮১ বছর। প্রায় ৫০ বছর ধরে বায়োস্কোপ দেখিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। ৩০ বছর বয়সে যশোরের বেনাপোল এলাকায় কাঠমিস্ত্রির কাজ করার সময় ১৮ টাকায় একটি বায়োস্কোপ কিনেছিলেন। পরে সেটির নাম দেন ‘কায়দার কায়দা’।
সেই থেকে শুরু। গ্রাম থেকে গ্রাম, হাট থেকে মেলা—কাঁধে বায়োস্কোপের বাক্স আর হাতে ডুগডুগি নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন সর্বানন্দ। তাঁর ছন্দময় ডাক শুনে শিশু-কিশোরেরা ছুটে আসত পেছনে। একসময় তাঁর বায়োস্কোপ দেখতে ভিড় করতেন বিভিন্ন বয়সের মানুষও।
বায়োস্কোপের ভেতরে ছিল জাতীয় পতাকা, মুক্তিযুদ্ধ, বিশ্বের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান, পশুপাখিসহ নানা ধরনের ছবি। একসঙ্গে পাঁচজন দর্শক ছবি দেখার সুযোগ পেতেন।
শুরুর দিকে একবার বায়োস্কোপ দেখাতে কখনো এক মুঠো চাল, কখনো পাঁচ বা দশ পয়সা নেওয়া হতো। পরে সেই মূল্য বেড়ে ৫০ পয়সায় দাঁড়ায়। সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে মানুষের বিনোদনের ধরন, এসেছে টেলিভিশন, মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট। ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী বায়োস্কোপও।
তবে সর্বানন্দ মধুর ‘কায়দার কায়দা’ থামেনি।
এখন বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার মেলা, পার্বণ কিংবা স্থানীয় অনুষ্ঠানে বায়োস্কোপ নিয়ে হাজির হন তিনি। জনপ্রতি ১০ টাকা করে নেন। কেউ কেউ খুশি হয়ে দেন আরও বেশি। দিনে আয় হয় প্রায় এক থেকে দেড় হাজার টাকা।
শুধু বায়োস্কোপ দেখিয়েই সংসার চালাননি সর্বানন্দ। তাঁর জীবনের গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অভাব আর সংগ্রামও। বাবা ছিলেন কাঠমিস্ত্রি। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বানন্দ ছোটবেলায় অভাবের কারণে পড়াশোনা করতে পারেননি। বাবার কাছেই কাঠমিস্ত্রির কাজ শিখেছিলেন। একসময় নিজের পড়াশোনার বই পর্যন্ত বিক্রি করে খাবার কিনতে হয়েছিল তাঁকে।
পরে বায়োস্কোপ দেখিয়ে উপার্জন করে ভাই-বোন ও সন্তানদের পড়াশোনা করিয়েছেন। কিনেছেন জমিজমাও।
আজ বয়সের ভারে শরীর কিছুটা নুয়ে পড়লেও বায়োস্কোপের বাক্সটি এখনও তাঁর কাঁধে ওঠে। লাল রঙের বাক্সটির সামনের দিকে চোঙার মতো কয়েকটি মুখ, প্রতিটিতে একটি করে লেন্স। বাক্সের ভেতরে কাপড়ে আঁকা বা লাগানো ছবি। দুটি কাঠির সঙ্গে পেঁচানো সেই কাপড় হ্যান্ডেল ঘোরালে এক পাশ থেকে অন্য পাশে সরে যায়। আর সেই ছবিই লেন্সের মাধ্যমে দেখতে পান দর্শকেরা।
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সময়ে দাঁড়িয়ে সর্বানন্দের বায়োস্কোপ যেন হারিয়ে যাওয়া এক সময়ের স্মৃতি। কিন্তু তাঁর কাছে এটি শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; পাঁচ দশকের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক পেশা, এক পরিচয়।
‘কায়দার কায়দা’ বায়োস্কোপ দেখাতে দেখাতেই সর্বানন্দ মধু এখন অনেকের কাছে নিজেই হয়ে উঠেছেন ‘কায়দার কায়দা’ নামে পরিচিত এক জীবন্ত ঐতিহ্য।
মোঃ রিয়াজুল ইসলাম 



















