সাকিব আহসান, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি||
সমাজে আজ হঠাৎ করে সহিংসতা বাড়ছে না। অস্থিরতার আগুন যেন বহুদিন ধরে জমে থাকা শুকনো পাতায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। প্রশ্ন উঠছেই—এর উৎস কোথায়? শুধুই কি অর্থনীতি? না কি রাজনীতি? না কি, আর একটু গভীরে, আমাদের চিন্তা-পদ্ধতির জিনগত কাঠামোতেই এর সূত্রপাত?
আসুন একটুখানি পিছনে তাকাই।
প্রথম ধাপ: ঐক্যের জিনতত্ত্ব
ধরা যাক, এক হাজার মানুষ—তাদের সবার চিন্তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছিল একটিই মতাদর্শ, একটিই বিশ্বাসের ছাঁচ। তারা কেবল নিজেরাই সেই আদর্শ মেনে চলেনি, বরং তাতে অন্যকেও রাঙাতে চেয়েছে। তৈরি হয়েছে একটা বড় ‘দল’—একই আদর্শের সৈনিক।
দ্বিতীয় ধাপ: মতের ভিতরে ফাটল
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন সেই এক হাজার মানুষই আর এককভাবে সেই আদর্শ মানতে নারাজ হয়। কেউ ব্যাখ্যা করে একরকম, কেউ আবার ঠিক তার উল্টোভাবে। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব শুরু হয়, যার ঢেউ গিয়ে লাগে অনুসারীদের ওপর। প্রশ্ন, সংশয়, মতভেদ—সব মিলিয়ে আদর্শটা ভেঙে পড়ে নিজের ভিতরেই।
তৃতীয় ধাপ: বিভাজনের জন্ম
অনুসারীরাও আর এক কাতারে থাকেন না। কেউ এক মতের, কেউ আরেক। আদর্শ ভেঙে খণ্ড খণ্ড ‘উপ-দর্শনে’ পরিণত হয়। একসময় যেটা ছিল বৃহৎ একটা ভাবধারা, সেটাই হয়ে দাঁড়ায় ছোট ছোট গোষ্ঠীগত আত্মপরিচয়।
চতুর্থ ধাপ: ঐক্য থেকে এককত্বে
প্রত্যেকটি উপ-দর্শন তখন নিজস্ব ‘স্বাধীনতা’ দাবি করে বসে। আর এই নিজস্বতা-চর্চা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, মূল আদর্শটাই কোথায় হারিয়ে যায়। এক সময়ের ‘ধ্রুব’ বৈশিষ্ট্য বিবর্তনের জোয়ারে গলে যায়, মিলিয়ে যায় ইতিহাসে।
পঞ্চম ধাপ: জন্ম নেয় পরমত-অসহিষ্ণুতা
এবার শুরু হয় ভয়াবহ পর্ব—পরমত-অসহিষ্ণুতা। যার যার মত, সেটাই শ্রেষ্ঠ—এমন বিশ্বাস থেকে জন্ম নেয় অসহিষ্ণু গোষ্ঠীবাদ। এখানেই সমাজে ঢোকে ‘Social Cannibalism’—নিজেদের মধ্যেই শুরু হয় মানসিক নরমাংসভক্ষণ।
ফলাফল? সহিংসতা। আত্মঘাতী ঘৃণা। গোষ্ঠীভিত্তিক সন্ত্রাস।
একটি প্রশ্ন আজ জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে—এই সহিংসতার রূপরেখা কি আসলেই নতুন? নাকি আমরা সেই সহস্র বছর আগের বংশীয়-দর্শনিক দ্বন্দ্বকেই বয়ে চলেছি একবিংশ শতাব্দীর ‘লিগ্যাসি’ হিসেবে?
আজকে সমাজে ‘অস্থিরতা’ আসলে একটি বহু প্রজন্মব্যাপী মতবাদ-সংকটের ফল।
এই সংকটের নাম মতান্ধতা, অসহিষ্ণুতা, আত্মপরিচয়ের সংকট। আমরা নিজেরা নিজেদের চিনতে পারি না, মানতে পারি না, সহ্য তো করাই দূরের কথা।
কিন্তু এখানেই যদি দাঁড়াই, তবে উত্তর কোথায়?
সমাজ কি তবে এই আত্মঘাতী বিভক্তির গহ্বরে আরও তলিয়ে যাবে? নাকি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে, ভিন্ন মতকে স্থান দিয়ে, নতুন এক সহনশীল সমাজ গড়ার দিকে এগিয়ে যাবে?
একই DNA-র মানুষ, একদিন আবার কি ফিরে পাবে একটি অভিন্ন আদর্শের স্বপ্ন?
এই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতের হাতে নয়, আমাদের সচেতনতার উপর নির্ভর করছে।
বাঁচতে হলে ভিন্ন মত নয়, ভিন্নতাকে গ্রহণ করতে শিখতে হবে।
সাউথ বাংলা ডেস্ক 



















