গতকাল (২৬ এপ্রিল) দিবাগত রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকার মোহাম্মদপুরের একটি ছোট্ট ভাড়া বাসায় মায়ের ক্ষণিকের অনুপস্থিতিতে গলায় ফাঁস নিয়ে নিজের জীবন শেষ করে দিলেন জুলাই বিপ্লবে পুলিশের গুলিতে শহিদ হওয়া পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলার শহিদ জসিম হাওলাদারের কন্যা, লামিয়া (১৯)। লামিয়ার অকাল মৃত্যু পুরো দেশজুড়ে শোকের ছায়া ফেলেছে।
আজ (২৭ এপ্রিল) সন্ধ্যায় লামিয়ার মরদেহ পটুয়াখালীর দুমকীতে পৌঁছায়। সেখানে জানাজায় অংশগ্রহণ করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, এনসিপির মূখ্যসংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ও অসংখ্য শোকাহত এলাকাবাসী।
এসময় এনসিপির (উত্তরাঞ্চল) মূখ্যসংগঠক সারজিস আলম বলেন, “এ ঘটনায় আমি বাকরুদ্ধ। একজন বোনকে এইভাবে হারানো কতটা মর্মান্তিক, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এমন যেন কখনো কোনো বোনের সাথে না ঘটে, এমনটিই আমাদের সকলের প্রার্থনা।”
এদিকে রুহুল কবির রিজভী বলেন, “এটি আমাদের সমাজের জন্য একটি বড় প্রশ্ন। আমাদের প্রশাসনকে আরও কঠোর এবং দায়িত্বশীল হতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।”
লামিয়ার জানাজা শেষে তার মরদেহ বাবার কবরের পাশে শায়িত করা হয়।
লামিয়ার জীবন ও মৃত্যুর পেছনের গল্পঃ লামিয়ার জীবন ছিল ভীষণ প্রতিকূলতার মধ্যে। শৈশব থেকে নানা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বড় হওয়া লামিয়া, শেষ পর্যন্ত তার প্রেমিক ইমরান মুন্সির প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের শিকার হন। প্রেমিক তাকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং লামিয়া সেই বিশ্বাসে তার বিরুদ্ধে মামলা করেননি। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, “তাকে বিয়ে করলেই সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে,” কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হয়ে যাওয়ার পর তার হৃদয় ভেঙে যায়।
এ ঘটনাকে শোকাহত হয়ে নেটিজেন ও স্থানীয়রা বলেছেন, “লামিয়ার সবচেয়ে বড় শূন্যতা ছিল তার তথাকথিত প্রেমিকের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ।” একদিকে, যেখানে তার জীবনের প্রতি ভালোবাসার এবং বিশ্বাসের খোঁজ ছিল, সেখানে বাস্তবতার নির্মম দিক তাকে এক চরম গহ্বরে ঠেলে দিয়েছিল।
১৮ মার্চ, এক মর্মান্তিক সন্ধ্যাঃ ওইদিন সন্ধ্যায় তার বাবার কবর জিয়ারত করে নানাবাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। কিন্তু সে জানতো না, তার পথের এই দুর্বিষহ পরিণতি। সাকিব ও সিফাত নামে দু’জন যুবক তাকে অনুসরণ করে এবং পাশের একটি বাগানে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে। পরে তারা তার ছবি তুলে এবং সমাজ মাধ্যমে তা ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয়। পরেরদিন লামিয়া তার উপর হওয়া অত্যাচারের বিরুদ্ধে দুমকী থানায় মামলা করেন। পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে আসামিদের গ্রেফতার করে এবং তাদের আদালতে সোপর্দ করে। আসামিরা বর্তমানে জেল হাজতে রয়েছেন এবং জামিন পাননি।
পরিবারের আহ্বানঃ লামিয়ার পরিবার ও বন্ধুরা সঠিক বিচার এবং সমাজের প্রতি তাদের দাবি জানিয়ে বলেন, “লামিয়া যদি সত্যিকার ভালোবাসা পেত, তবে হয়তো এভাবে জীবন শেষ করে দিতে হত না। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে সকলের বিচার চাই।”
এদিকে সুশীল সমাজের লোকজন বলছেন, এটি একটি গভীর বার্তা দেয়, যে সমাজের অবহেলা এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের যন্ত্রণা এক তরুণীকে এমন বিপদের দিকে ঠেলে দিতে পারে। লামিয়ার মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত বিপর্যয় নয়, এটি আমাদের সকলের জন্য একটি সতর্কবাণী।
সাউথ বাংলা ডেস্ক 

























