ঢাকা ০৩:৪৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
খুলনায় ঘর কেড়ে নিয়েছে নদী,স্বপ্ন কেড়ে নিচ্ছে শহর খুলনায় র‌্যাবের অভিযানে বিপুল ইয়াবা উদ্ধার,গ্রেপ্তার-৪ ইয়াবাসহ আটকের পর ছাত্রদলের দুই নেতা বহিষ্কার সাপে কামড়ের পর অ্যান্টিভেনম না দিয়ে রেফার, পথে অ্যাম্বুলেন্সে মৃত্যু  সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে লড়াই, ঘরভাড়া দিতে চুল বিক্রি করলেন রেহানা ধর্মপাশায় পানিতে ডুবে আপন দুই ভাইবোনের মর্মান্তিক মৃত্যু পটুয়াখালীর দুমকিতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টা, আটক ১ পাবনায় গোপন কক্ষে চোরাই গরু, পুলিশের হাতে আটক-১ ‘বাবা কোথায়?’—জুলাই শহীদের মেয়ের প্রশ্ন, স্ত্রী চান বিচার ও চাকরি শিবগঞ্জ সীমান্তে ৫৯ বিজিবির অভিযান, এসকাফ সিরাপসহ আটক-১

হাঁটুপানি পেরিয়ে পরীক্ষাঃ একাডেমিক ক্যালেন্ডার বনাম জলবায়ুর বাস্তবতা

বর্ষা প্রকৃতির অপরিহার্য অংশ। কিন্তু এই ঋতুই যখন অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যার কারণহয় তখন জনজীবন স্থবির করে দেয়। এসময় সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন শিক্ষার্থীরা। হাঁটুপানি কিংবা কোমরসমান পানি পেরিয়ে, কোথাও নৌকায় চড়ে, কোথাও দীর্ঘ যানজট অতিক্রম করে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানোর দৃশ্য শুধু দুর্ভোগের চিত্র নয়; এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রস্তুতি ও ন্যায়সংগত সুযোগ নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

এইচএসসি পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, এটাকে গোল্ডেন পিরিয়ড অব লাইফ বলা হয়ে থাকে। উচ্চশিক্ষায় ভর্তি থেকে শুরু করে ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের অনেক সম্ভাবনার ভিত্তি তৈরি হয় এই পরীক্ষার ফলাফলের ওপর। তাই পরীক্ষার পরিবেশ এমন হওয়া উচিত, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী সমান সুযোগ নিয়ে অংশ নিতে পারে। কিন্তু এক অঞ্চলের পরীক্ষার্থী যখন স্বাভাবিক পরিবেশে পরীক্ষা দেয় এবং অন্য অঞ্চলের পরীক্ষার্থী দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে কেন্দ্রে পৌঁছায়, তখন সেই সমান সুযোগ বাস্তবে আর সমান থাকে না।

কোভিড-১৯ মহামারী, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোর প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের শিক্ষা ক্যালেন্ডারকে একাধিকবার পরিবর্তনের মুখে ফেলেছে। দীর্ঘদিনের পরীক্ষাসূচি বারবার পিছিয়েছে। এবারও টানা বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তির মধ্যে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। কিছু এলাকায় পরীক্ষা স্থগিত করা হলেও অন্য অনেক এলাকায় একই ধরনের পরিস্থিতির মধ্যেই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানদণ্ড নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটিরও বাস্তব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অভিন্ন প্রশ্নপত্র, বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থী এবং জাতীয় পর্যায়ের সমন্বয়—সবকিছু বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তবে প্রশাসনিক বাস্তবতার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সমান সুযোগের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। বিশেষ করে যখন আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র আগাম ঝুঁকির তথ্য দিয়ে থাকে, তখন পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণে সেই তথ্য আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন বাংলাদেশের স্থায়ী বাস্তবতা। ফলে ভবিষ্যতের শিক্ষা পরিকল্পনাও সেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। দুর্যোগপ্রবণ এলাকার জন্য বিকল্প সময়সূচি, জাতীয় পরীক্ষায় ‘রিজার্ভ ডে’ রাখা, স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী সীমিত পরিসরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদে তুলনামূলক অনুকূল মৌসুমে পরীক্ষা আয়োজন—এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে।

শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় পরিস্থিতির সঠিক তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে বিকল্প ব্যবস্থা প্রস্তাব করা তাদের দায়িত্বের অংশ। একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা ও কার্যকর যোগাযোগ থাকলে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের উদ্বেগও অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের সিনিয়র অধ্যাপক ও বিএনপির গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খান বলেন, “প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও যদি শিক্ষা ক্যালেন্ডার যথাযথভাবে পুনর্বিন্যাস না হয়, তবে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সমান সুযোগের প্রশ্ন সামনে আসবে। জলবায়ু-সহনশীল শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্থানীয় পর্যায়ের নমনীয়তা এবং দুর্যোগকালীন বিকল্প ব্যবস্থা জরুরি।”

শিক্ষা ব্যবস্থার সাফল্য কেবল নির্ধারিত দিনে পরীক্ষা গ্রহণে নয়; বরং প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য নিরাপদ, সমান ও ন্যায়সংগত পরিবেশ নিশ্চিত করার মধ্যেই নিহিত। বর্ষার পানি একসময় নেমে যাবে, কিন্তু দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষা দেওয়ার অভিজ্ঞতা অনেক শিক্ষার্থীর মনে দীর্ঘদিন থেকে যাবে। তাই সময় এসেছে একাডেমিক ক্যালেন্ডারকে জলবায়ু বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে পুনর্বিবেচনা করার। একটি আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত, যেখানে কোনো শিক্ষার্থীকে নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে অসম লড়াইয়ে নামতে না হয়।

লেখকঃ জুবাইয়া বিন্তে কবির

অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Md. Riajul Islam

Popular Post
Classic Software Technology

খুলনায় ঘর কেড়ে নিয়েছে নদী,স্বপ্ন কেড়ে নিচ্ছে শহর

হাঁটুপানি পেরিয়ে পরীক্ষাঃ একাডেমিক ক্যালেন্ডার বনাম জলবায়ুর বাস্তবতা

Update Time : ১২:১৯:২৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

বর্ষা প্রকৃতির অপরিহার্য অংশ। কিন্তু এই ঋতুই যখন অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যার কারণহয় তখন জনজীবন স্থবির করে দেয়। এসময় সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন শিক্ষার্থীরা। হাঁটুপানি কিংবা কোমরসমান পানি পেরিয়ে, কোথাও নৌকায় চড়ে, কোথাও দীর্ঘ যানজট অতিক্রম করে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানোর দৃশ্য শুধু দুর্ভোগের চিত্র নয়; এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রস্তুতি ও ন্যায়সংগত সুযোগ নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

এইচএসসি পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, এটাকে গোল্ডেন পিরিয়ড অব লাইফ বলা হয়ে থাকে। উচ্চশিক্ষায় ভর্তি থেকে শুরু করে ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের অনেক সম্ভাবনার ভিত্তি তৈরি হয় এই পরীক্ষার ফলাফলের ওপর। তাই পরীক্ষার পরিবেশ এমন হওয়া উচিত, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী সমান সুযোগ নিয়ে অংশ নিতে পারে। কিন্তু এক অঞ্চলের পরীক্ষার্থী যখন স্বাভাবিক পরিবেশে পরীক্ষা দেয় এবং অন্য অঞ্চলের পরীক্ষার্থী দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে কেন্দ্রে পৌঁছায়, তখন সেই সমান সুযোগ বাস্তবে আর সমান থাকে না।

কোভিড-১৯ মহামারী, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোর প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের শিক্ষা ক্যালেন্ডারকে একাধিকবার পরিবর্তনের মুখে ফেলেছে। দীর্ঘদিনের পরীক্ষাসূচি বারবার পিছিয়েছে। এবারও টানা বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তির মধ্যে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। কিছু এলাকায় পরীক্ষা স্থগিত করা হলেও অন্য অনেক এলাকায় একই ধরনের পরিস্থিতির মধ্যেই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানদণ্ড নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটিরও বাস্তব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অভিন্ন প্রশ্নপত্র, বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থী এবং জাতীয় পর্যায়ের সমন্বয়—সবকিছু বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তবে প্রশাসনিক বাস্তবতার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সমান সুযোগের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। বিশেষ করে যখন আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র আগাম ঝুঁকির তথ্য দিয়ে থাকে, তখন পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণে সেই তথ্য আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন বাংলাদেশের স্থায়ী বাস্তবতা। ফলে ভবিষ্যতের শিক্ষা পরিকল্পনাও সেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। দুর্যোগপ্রবণ এলাকার জন্য বিকল্প সময়সূচি, জাতীয় পরীক্ষায় ‘রিজার্ভ ডে’ রাখা, স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী সীমিত পরিসরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদে তুলনামূলক অনুকূল মৌসুমে পরীক্ষা আয়োজন—এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে।

শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় পরিস্থিতির সঠিক তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে বিকল্প ব্যবস্থা প্রস্তাব করা তাদের দায়িত্বের অংশ। একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা ও কার্যকর যোগাযোগ থাকলে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের উদ্বেগও অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের সিনিয়র অধ্যাপক ও বিএনপির গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খান বলেন, “প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও যদি শিক্ষা ক্যালেন্ডার যথাযথভাবে পুনর্বিন্যাস না হয়, তবে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সমান সুযোগের প্রশ্ন সামনে আসবে। জলবায়ু-সহনশীল শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্থানীয় পর্যায়ের নমনীয়তা এবং দুর্যোগকালীন বিকল্প ব্যবস্থা জরুরি।”

শিক্ষা ব্যবস্থার সাফল্য কেবল নির্ধারিত দিনে পরীক্ষা গ্রহণে নয়; বরং প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য নিরাপদ, সমান ও ন্যায়সংগত পরিবেশ নিশ্চিত করার মধ্যেই নিহিত। বর্ষার পানি একসময় নেমে যাবে, কিন্তু দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষা দেওয়ার অভিজ্ঞতা অনেক শিক্ষার্থীর মনে দীর্ঘদিন থেকে যাবে। তাই সময় এসেছে একাডেমিক ক্যালেন্ডারকে জলবায়ু বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে পুনর্বিবেচনা করার। একটি আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত, যেখানে কোনো শিক্ষার্থীকে নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে অসম লড়াইয়ে নামতে না হয়।

লেখকঃ জুবাইয়া বিন্তে কবির

অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট।

প্রিন্ট করুন :