ঢাকা ০৭:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
দুমকিতে ইউপি হালটে কবরস্থানের দেয়াল নির্মাণের অভিযোগ, অবরুদ্ধ প্রকৌশলী পরিবার পবিপ্রবিতে যথাযোগ্য মর্যাদায় জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালিত গোয়াইনঘাট থানা সদরের প্রথম- ‘স্ট্রাইকার জোন ফুটসাল ইনডোরের’ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন পাথরঘাটায় ২১ বছরের বিবাহিত আসামিকে চার্জশিটে ১৬ বছরের শিশু দেখানোর অভিযোগ গোয়াইনঘাটের চৌধুরী বিলে রাতের আঁধারে বিষ প্রয়োগ,ক্ষতির মুখে দুই মাছ চাষি আমতলীতে মকবুল খানের গনসংযোগে বাঁধভাঙা জনস্রোত আমতলীতে ৪৭০০ পিস ইয়াবাসহ স্বামী-স্ত্রী গ্রেপ্তার,পলাতক জামাতা চুনারুঘাটে একাধিক মামলার আসামি জাহির-রাজু প্রকাশ্যে, গ্রেপ্তার নিয়ে প্রশ্ন বাকেরগঞ্জে নারী দিয়ে ‘মব’ ছাত্রদল নেতাকে ফাঁসানোর অভিযোগ দুমকির গৃহবধূকে কুপিয়ে জখমের মামলায় প্রধান আসামি শাকিল ফকির আটক

উচ্চশিক্ষার মূল্যায়ন: নম্বরের বাইরে নতুন ভাবনা

একজন তরুণ-তরুণী বিশ্ববিদ্যালয়ে চার-পাঁচ বছর কাটান। এই সময়ে তিনি বই পড়েন, পরীক্ষা দেন, রাত জেগে অ্যাসাইনমেন্ট লেখেন। আবার কখনো বিতর্ক মঞ্চে দাঁড়ান, ক্লাবের নেতৃত্ব দেন, বন্যার্ত মানুষের পাশে ছুটে যান কিংবা গবেষণাগারে নতুন কিছু আবিষ্কারের চেষ্টা করেন। অথচ স্নাতক শেষে তাঁর সনদপত্রে এই দীর্ঘ পথচলার অধিকাংশই অনুপস্থিত থাকে। সেখানে থেকে যায় শুধু একটি সংখ্যা—সিজিপিএ (CGPA)। প্রশ্ন হলো, একজন মানুষের এত বছরের শেখা, সংগ্রাম, সৃজনশীলতা ও মানবিকতা কি সত্যিই একটি মাত্র সংখ্যায় ধরা সম্ভব?

একক সংখ্যার সীমাবদ্ধতাঃ

সিজিপিএ বিশ্বজুড়ে একাডেমিক পারফরম্যান্স মূল্যায়নের একটি স্বীকৃত ও সহজ পদ্ধতি। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ফলাফল তুলনা করা সহজ হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একজন শিক্ষার্থীর সামগ্রিক সক্ষমতা কেবল পরীক্ষার নম্বরে সীমাবদ্ধ নয়।

কেউ হয়তো অসাধারণ সংগঠক, দক্ষ বক্তা বা গবেষণামনস্ক। কেউ সমাজসেবা, স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম কিংবা সাংস্কৃতিক চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কিন্তু এসব অর্জনের খুব কমই তাঁর ট্রান্সক্রিপ্টে প্রতিফলিত হয়। ফলে একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত যোগ্যতা অনেক সময় একটি সংখ্যার আড়ালেই চাপা পড়ে যায়।

এই প্রবণতার আরেকটি নেতিবাচক দিকও রয়েছে। ক্যাম্পাসে জ্ঞানার্জনের চেয়ে গ্রেড অর্জনের প্রতিযোগিতা বড় হয়ে ওঠে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রস্তুতি সৃজনশীল চিন্তা, গবেষণামনস্কতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে দুর্বল করে। একই সঙ্গে উচ্চ সিজিপিএ ধরে রাখার চাপ অনেক শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলে।

বিকল্প এক দিগন্ত: আই-সিজিপিএঃ

এই বাস্তবতা থেকেই আলোচনায় এসেছে Integrated Cumulative Grade Point Average (I-CGPA) বা সমন্বিত সিজিপিএ।

এর মূল ধারণা হলো, শুধু পরীক্ষার ফল নয়—নেতৃত্ব, গবেষণা, সৃজনশীলতা, সামাজিক সম্পৃক্ততা, নৈতিকতা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং অন্যান্য সফট স্কিলকেও মূল্যায়নের অংশ করা। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থীর সনদ হবে তাঁর সামগ্রিক বিকাশের প্রতিফলন।

ধারণাটি একেবারেই নতুন নয়। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে Graduate Attributes Framework, Student Portfolio এবং Holistic Evaluation-এর মতো পদ্ধতিতে শ্রেণিকক্ষের বাইরের অর্জনও মূল্যায়নের আওতায় আনা হচ্ছে। মালয়েশিয়াও তাদের উচ্চশিক্ষায় I-CGPA 2.0 বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। কারণ আধুনিক বিশ্ব বুঝতে শুরু করেছে, শুধু পরীক্ষার ফল দিয়ে একজন মানুষের পূর্ণ সক্ষমতা বিচার করা সম্ভব নয়।

বদলে যাওয়া চাকরির বাজারঃ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের যুগে কর্মক্ষেত্রের চাহিদাও দ্রুত বদলাচ্ছে। নিয়োগদাতারা এখন শুধু ভালো ফলাফল নয়, এমন মানুষ খোঁজেন যিনি সমস্যার সমাধান করতে পারেন, দল নিয়ে কাজ করতে পারেন, কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে পারেন এবং নৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম।

সমালোচনামূলক চিন্তা, নেতৃত্ব, দলগত কাজ, অভিযোজন ক্ষমতা ও সৃজনশীলতা আজ আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়ন কাঠামো যদি এসব গুণকে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব কর্মজীবনের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটঃ

বাংলাদেশে এখনো উচ্চশিক্ষার প্রধান মূল্যায়ন সূচক সিজিপিএ। ফলে বিতর্ক, গবেষণা, স্বেচ্ছাসেবা কিংবা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণকে অনেক শিক্ষার্থী গৌণ মনে করেন, কারণ এগুলোর প্রতিফলন চূড়ান্ত ফলাফলে খুব একটা দেখা যায় না।

অথচ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে এমন নাগরিক তৈরির ওপর, যাঁরা শুধু জ্ঞানী নন, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিও দায়বদ্ধ। তাই ধীরে ধীরে পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়নের পাশাপাশি দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক মূল্যায়নের দিকেও এগিয়ে যাওয়া সময়ের দাবি।

এ ক্ষেত্রে ৩৬০ ডিগ্রি ফিডব্যাক পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে। একজন শিক্ষার্থীর মূল্যায়নে শিক্ষক, উপদেষ্টা, সহপাঠী এবং শিক্ষার্থীর আত্মমূল্যায়ন—সবগুলো দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় ঘটানো যেতে পারে। উদ্দেশ্য শাস্তি দেওয়া নয়; বরং শক্তি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করে তাঁকে আরও পরিণত করে তোলা।

বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জঃ

তবে আই-সিজিপিএ বাস্তবায়ন সহজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত শিক্ষক, নিরপেক্ষ মূল্যায়ন কাঠামো, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করা এবং পর্যাপ্ত অর্থায়ন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মূল্যায়নে যেন ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পক্ষপাত বা প্রভাব কাজ না করে। তাই শুরুতেই সব বিশ্ববিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলকভাবে চালুর পরিবর্তে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়ন করে অভিজ্ঞতা অর্জন করাই হতে পারে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।

অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন—দেশপ্রেম, সততা বা নৈতিকতার মতো বিষয় কি আদৌ মূল্যায়ন করা সম্ভব? অনুভূতি হয়তো সরাসরি মাপা যায় না, কিন্তু তার প্রকাশ অবশ্যই মূল্যায়নযোগ্য। একজন শিক্ষার্থী স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে অংশ নিচ্ছেন কি না, পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখছেন কি না কিংবা সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিচয় দিচ্ছেন কি না—এসব আচরণ মূল্যায়নের অংশ হতে পারে।

এগিয়ে যাওয়ার পথঃ

আই-সিজিপিএ বাস্তবায়নে তাড়াহুড়োর সুযোগ নেই। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষাবিদদের অংশগ্রহণে একটি জাতীয় কাঠামো তৈরি করতে হবে।

প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল পোর্টফোলিও, স্বচ্ছ মূল্যায়ন রুব্রিক এবং স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা এই প্রক্রিয়াকে আরও গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি ঘটতে হবে একাডেমিক সংস্কৃতিতে। যে ক্যাম্পাসে প্রশ্ন করার স্বাধীনতা নেই, গবেষণাকে উৎসাহ দেওয়া হয় না এবং মতের ভিন্নতাকে সম্মান করা হয় না, সেখানে আধুনিক মূল্যায়ন কাঠামোও কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারবে না। তাই পরিবর্তনের শুরু হতে হবে মুক্তচিন্তা, সহযোগিতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার সংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমে।

শেষ কথাঃ

আই-সিজিপিএর উদ্দেশ্য সিজিপিএকে বাতিল করা নয়; বরং তাকে আরও মানবিক, বাস্তবমুখী ও সময়োপযোগী করে তোলা। একাডেমিক উৎকর্ষের পাশাপাশি চরিত্র, দক্ষতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকে মূল্যায়নের আওতায় আনতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া একজন শিক্ষার্থী শুধু চাকরিপ্রার্থী নন, বরং সমাজ পরিবর্তনের একজন সচেতন অংশীদার হয়ে উঠবেন।

আগামী দিনের পৃথিবী শুধু উচ্চ নম্বরধারী স্নাতক খুঁজবে না; খুঁজবে এমন মানুষ, যিনি জ্ঞানে সমৃদ্ধ, চরিত্রে দৃঢ় এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল। একটি ডিগ্রি কর্মজীবনের সূচনা করতে পারে, কিন্তু একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করে তাঁর মূল্যবোধ, সততা এবং মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা। উচ্চশিক্ষার মূল্যায়ন ব্যবস্থাকেও তাই সেই বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

লেখকঃ জুবাইয়া বিন্তে কবির

অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Md. Riajul Islam

Popular Post
Classic Software Technology

দুমকিতে ইউপি হালটে কবরস্থানের দেয়াল নির্মাণের অভিযোগ, অবরুদ্ধ প্রকৌশলী পরিবার

উচ্চশিক্ষার মূল্যায়ন: নম্বরের বাইরে নতুন ভাবনা

Update Time : ১২:০৮:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

একজন তরুণ-তরুণী বিশ্ববিদ্যালয়ে চার-পাঁচ বছর কাটান। এই সময়ে তিনি বই পড়েন, পরীক্ষা দেন, রাত জেগে অ্যাসাইনমেন্ট লেখেন। আবার কখনো বিতর্ক মঞ্চে দাঁড়ান, ক্লাবের নেতৃত্ব দেন, বন্যার্ত মানুষের পাশে ছুটে যান কিংবা গবেষণাগারে নতুন কিছু আবিষ্কারের চেষ্টা করেন। অথচ স্নাতক শেষে তাঁর সনদপত্রে এই দীর্ঘ পথচলার অধিকাংশই অনুপস্থিত থাকে। সেখানে থেকে যায় শুধু একটি সংখ্যা—সিজিপিএ (CGPA)। প্রশ্ন হলো, একজন মানুষের এত বছরের শেখা, সংগ্রাম, সৃজনশীলতা ও মানবিকতা কি সত্যিই একটি মাত্র সংখ্যায় ধরা সম্ভব?

একক সংখ্যার সীমাবদ্ধতাঃ

সিজিপিএ বিশ্বজুড়ে একাডেমিক পারফরম্যান্স মূল্যায়নের একটি স্বীকৃত ও সহজ পদ্ধতি। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ফলাফল তুলনা করা সহজ হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একজন শিক্ষার্থীর সামগ্রিক সক্ষমতা কেবল পরীক্ষার নম্বরে সীমাবদ্ধ নয়।

কেউ হয়তো অসাধারণ সংগঠক, দক্ষ বক্তা বা গবেষণামনস্ক। কেউ সমাজসেবা, স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম কিংবা সাংস্কৃতিক চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কিন্তু এসব অর্জনের খুব কমই তাঁর ট্রান্সক্রিপ্টে প্রতিফলিত হয়। ফলে একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত যোগ্যতা অনেক সময় একটি সংখ্যার আড়ালেই চাপা পড়ে যায়।

এই প্রবণতার আরেকটি নেতিবাচক দিকও রয়েছে। ক্যাম্পাসে জ্ঞানার্জনের চেয়ে গ্রেড অর্জনের প্রতিযোগিতা বড় হয়ে ওঠে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রস্তুতি সৃজনশীল চিন্তা, গবেষণামনস্কতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে দুর্বল করে। একই সঙ্গে উচ্চ সিজিপিএ ধরে রাখার চাপ অনেক শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলে।

বিকল্প এক দিগন্ত: আই-সিজিপিএঃ

এই বাস্তবতা থেকেই আলোচনায় এসেছে Integrated Cumulative Grade Point Average (I-CGPA) বা সমন্বিত সিজিপিএ।

এর মূল ধারণা হলো, শুধু পরীক্ষার ফল নয়—নেতৃত্ব, গবেষণা, সৃজনশীলতা, সামাজিক সম্পৃক্ততা, নৈতিকতা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং অন্যান্য সফট স্কিলকেও মূল্যায়নের অংশ করা। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থীর সনদ হবে তাঁর সামগ্রিক বিকাশের প্রতিফলন।

ধারণাটি একেবারেই নতুন নয়। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে Graduate Attributes Framework, Student Portfolio এবং Holistic Evaluation-এর মতো পদ্ধতিতে শ্রেণিকক্ষের বাইরের অর্জনও মূল্যায়নের আওতায় আনা হচ্ছে। মালয়েশিয়াও তাদের উচ্চশিক্ষায় I-CGPA 2.0 বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। কারণ আধুনিক বিশ্ব বুঝতে শুরু করেছে, শুধু পরীক্ষার ফল দিয়ে একজন মানুষের পূর্ণ সক্ষমতা বিচার করা সম্ভব নয়।

বদলে যাওয়া চাকরির বাজারঃ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের যুগে কর্মক্ষেত্রের চাহিদাও দ্রুত বদলাচ্ছে। নিয়োগদাতারা এখন শুধু ভালো ফলাফল নয়, এমন মানুষ খোঁজেন যিনি সমস্যার সমাধান করতে পারেন, দল নিয়ে কাজ করতে পারেন, কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে পারেন এবং নৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম।

সমালোচনামূলক চিন্তা, নেতৃত্ব, দলগত কাজ, অভিযোজন ক্ষমতা ও সৃজনশীলতা আজ আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়ন কাঠামো যদি এসব গুণকে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব কর্মজীবনের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটঃ

বাংলাদেশে এখনো উচ্চশিক্ষার প্রধান মূল্যায়ন সূচক সিজিপিএ। ফলে বিতর্ক, গবেষণা, স্বেচ্ছাসেবা কিংবা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণকে অনেক শিক্ষার্থী গৌণ মনে করেন, কারণ এগুলোর প্রতিফলন চূড়ান্ত ফলাফলে খুব একটা দেখা যায় না।

অথচ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে এমন নাগরিক তৈরির ওপর, যাঁরা শুধু জ্ঞানী নন, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিও দায়বদ্ধ। তাই ধীরে ধীরে পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়নের পাশাপাশি দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক মূল্যায়নের দিকেও এগিয়ে যাওয়া সময়ের দাবি।

এ ক্ষেত্রে ৩৬০ ডিগ্রি ফিডব্যাক পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে। একজন শিক্ষার্থীর মূল্যায়নে শিক্ষক, উপদেষ্টা, সহপাঠী এবং শিক্ষার্থীর আত্মমূল্যায়ন—সবগুলো দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় ঘটানো যেতে পারে। উদ্দেশ্য শাস্তি দেওয়া নয়; বরং শক্তি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করে তাঁকে আরও পরিণত করে তোলা।

বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জঃ

তবে আই-সিজিপিএ বাস্তবায়ন সহজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত শিক্ষক, নিরপেক্ষ মূল্যায়ন কাঠামো, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করা এবং পর্যাপ্ত অর্থায়ন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মূল্যায়নে যেন ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পক্ষপাত বা প্রভাব কাজ না করে। তাই শুরুতেই সব বিশ্ববিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলকভাবে চালুর পরিবর্তে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়ন করে অভিজ্ঞতা অর্জন করাই হতে পারে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।

অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন—দেশপ্রেম, সততা বা নৈতিকতার মতো বিষয় কি আদৌ মূল্যায়ন করা সম্ভব? অনুভূতি হয়তো সরাসরি মাপা যায় না, কিন্তু তার প্রকাশ অবশ্যই মূল্যায়নযোগ্য। একজন শিক্ষার্থী স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে অংশ নিচ্ছেন কি না, পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখছেন কি না কিংবা সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিচয় দিচ্ছেন কি না—এসব আচরণ মূল্যায়নের অংশ হতে পারে।

এগিয়ে যাওয়ার পথঃ

আই-সিজিপিএ বাস্তবায়নে তাড়াহুড়োর সুযোগ নেই। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষাবিদদের অংশগ্রহণে একটি জাতীয় কাঠামো তৈরি করতে হবে।

প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল পোর্টফোলিও, স্বচ্ছ মূল্যায়ন রুব্রিক এবং স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা এই প্রক্রিয়াকে আরও গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি ঘটতে হবে একাডেমিক সংস্কৃতিতে। যে ক্যাম্পাসে প্রশ্ন করার স্বাধীনতা নেই, গবেষণাকে উৎসাহ দেওয়া হয় না এবং মতের ভিন্নতাকে সম্মান করা হয় না, সেখানে আধুনিক মূল্যায়ন কাঠামোও কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারবে না। তাই পরিবর্তনের শুরু হতে হবে মুক্তচিন্তা, সহযোগিতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার সংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমে।

শেষ কথাঃ

আই-সিজিপিএর উদ্দেশ্য সিজিপিএকে বাতিল করা নয়; বরং তাকে আরও মানবিক, বাস্তবমুখী ও সময়োপযোগী করে তোলা। একাডেমিক উৎকর্ষের পাশাপাশি চরিত্র, দক্ষতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকে মূল্যায়নের আওতায় আনতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া একজন শিক্ষার্থী শুধু চাকরিপ্রার্থী নন, বরং সমাজ পরিবর্তনের একজন সচেতন অংশীদার হয়ে উঠবেন।

আগামী দিনের পৃথিবী শুধু উচ্চ নম্বরধারী স্নাতক খুঁজবে না; খুঁজবে এমন মানুষ, যিনি জ্ঞানে সমৃদ্ধ, চরিত্রে দৃঢ় এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল। একটি ডিগ্রি কর্মজীবনের সূচনা করতে পারে, কিন্তু একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করে তাঁর মূল্যবোধ, সততা এবং মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা। উচ্চশিক্ষার মূল্যায়ন ব্যবস্থাকেও তাই সেই বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

লেখকঃ জুবাইয়া বিন্তে কবির

অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট।

প্রিন্ট করুন :