ছোট্ট শরীরে সিগারেট ও কয়েলের ছ্যাঁকা, প্লাস দিয়ে হাতের আঙুলের নখ উপড়ে ফেলা, শরীরে কামড়িয়ে চামড়া তুলে ফেলা, অনাহারে রাখাসহ নানান পাশবিক নির্যাতনে বানানো হয় প্রায় প্রতিবন্ধী। রাতভর এভাবেই চলতো নির্যাতন। আর দিনের বেলায় করানো হতো ভিক্ষা।

কোন সিনেমার কাহিনি নয়, পাবনা সদর উপজেলার চক ছাতিয়ানী এলাকায় ছয় মাস আগে অপহরণ হওয়া ছোট্ট শিশু সোয়াইব হোসেন(৬) এর কথা বলছি।
সূত্র জানায়, ওই এলাকার আমিনুল ইসলাম ও সোহানা জাহান দম্পতির সন্তান সোয়াইব (৬)। বাবা অন্যত্র বিয়ে করায় মায়ের কাছেই থাকতো সে। গত বছরের ২ অক্টোবর একই উপজেলার শানির দিয়ার এলাকার আমজাদ হোসেনের ছেলে রফিকুল ইসলাম বিপ্লব বিস্কুট কিনে দেয়ার কথা বলে শিশুটিকে অপহরণ করে। সন্তানের খোঁজ না পেয়ে ওই বছরের ৭ অক্টোবর পাবনা সদর থানায় একটি জিডি করেন শিশুটির সোহানা জাহান।
১৯ জুলাই তথ্য প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে মৃতপ্রায় শিশুটিকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয়েছে অভিযুক্ত রফিকুল ইসলাম বিপ্লবকে (৩০)।
পুলিশের ভাষ্য, আত্মগোপনে থাকা অভিযুক্ত রফিকুল ইসলাম বিপ্লব শিশু সোয়াইবের মাকে ফোন করে অপহরণ করেছে বলে জানিয়েছিল। বেশিরভাগ সময় তার ফোন বন্ধ থাকতো। জিডির পর ফোন নাম্বার ট্র্যাক করে তার লোকেশন সনাক্তের চেষ্টা করে পুলিশ। ঘটনার ছয় মাস পর গত ১৮ এপ্রিল খুলনার রুপসা ফেরিঘাট এলাকা থেকে ভিক্ষা করানো অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় অভিযুক্ত রফিকুল ইসলাম বিপ্লবকেও আটক করা হয়।
এরপরই বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর ও শিশুটির ওপর বর্বরতার কথা। ভুক্তভোগী শিশু সোয়াইব জানায়, রাতে তাকে একটি কক্ষে বন্দি করে রাখতেন রফিকুল ইসলাম বিপ্লব। সারা শরীরে দেয়া হতো সিগারেট ও কয়েলের আগুনের ছ্যাঁকা। দিনের বেলায় বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে তাকে দিয়ে ভিক্ষা করাতেন বিপ্লব।
সোয়াইবের মা সোহানা জাহান বলেন, ‘পূর্ব পরিচয়ের সুত্র ধরে সেদিন বিপ্লব আমার কাছ থেকে ছেলেটাকে নিয়ে যায় বিস্কুট কিনে দেবে বলে। তারপর থেকে ছেলেকে আর খুঁজে পাইনি।
সোহানা জাহান আরো বলেন, ’উদ্ধারের পর প্রথম দেখায় তো আমার ছেলেকে চিনতেই পারিনি। দিনের পর দিন কিভাবে আমার শিশু সন্তানকে নির্যাতন করেছে ভাবতেই বুকটা ফেটে যায়। প্রায় প্রতিবন্ধী বানিয়ে ফেলেছে আমার ছেলেকে। কঙ্কালসার শরীর নিয়ে ছেলেটা নড়াচড়াও করতে পারছে না। আমি অভিযুক্ত বিপ্লবের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি ফাঁসি চাই।’
এ বিষয়ে পাবনা জেনারেল হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগের প্রধান ডা. মাসুদুর রহমান প্রিন্স বলেন, ‘দিনের পর দিন না খাইয়ে রাখা ও অব্যাহত শারীরিক নির্যাতনের কারণে শিশু সোয়াইবের এই অবস্থা। তার শারীরিক অবস্থা খুব একটা ভাল নয়। তার হাতের একটা আঙুল কেটে ফেলতে হবে। আমরা আমাদের সাধ্যমতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিচ্ছি। ঠিকমতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে আশা করছি দুই মাসের মধ্যে শিশুটি সুস্থ্য হয়ে উঠবে।’
পাবনা সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) এ এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, ’মুলত অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে শিশুটিকে এক প্রকার প্রতিবন্ধী বানিয়ে তাকে ভিক্ষা করাতেন অভিযুক্ত বিপ্লব। অমানবিক একটি ঘটনা। আমরা তথ্য প্রযুক্তি ও খুলনার রুপসা ফেরিঘাট ফাঁড়ি পুলিশের সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তার এবং শিশুটিকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। ইতিমধ্যে এ ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করে অভিযুক্ত বিপ্লবকে ১৯ এপ্রিল আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আর শিশু সোয়াইব হোসাইন পাবনা জেনারেল হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগের ২৬ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন রয়েছে।’
সাউথ বাংলা ডেস্ক 




















