সৈয়দ নুর আহসান
গৌরনদী (বরিশাল) প্রতিনিধি : দেশব্যাপী আলোচিত বরিশালের গৌরনদী উপজেলার হরিসেনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘মিড-ডে মিলের রুটির মধ্যে ব্লেড’ পাওয়ার ঘটনায় তদন্তে উঠে এসেছে নতুন তথ্য।
উপজেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুটি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের কোনো গাফিলতি কিংবা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্লেড প্রবেশের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তদন্তে জানা গেছে, বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী নিজেই ব্লেডটি রুটির মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিল। এদিকে, ঘটনার সত্যতা যাচাই না করে ব্লেডসহ রুটির ছবি বিভিন্ন ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা শারমিন জাহানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি বিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
বুধবার(২৯ জুলাই) দুপুরে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও গৌরনদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সেকেন্দার শেখ তদন্ত প্রতিবেদন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইব্রাহীমের কাছে হস্তান্তর করেন।
ইউএনও জানান, দেশব্যাপী আলোচিত এ ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে তদন্ত কমিটি রুটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে সরেজমিন পরিদর্শন করে উৎপাদনের প্রতিটি ধাপ—মিক্সিং, ডো প্রস্তুত, বেকিং ও প্যাকেজিং—পর্যবেক্ষণ করে। বিভিন্ন ধাপে ব্লেড ব্যবহার করে পরীক্ষাও চালানো হয়।
তদন্তে দেখা যায়, সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থায় একটি অক্ষত ব্লেড রুটির ভেতরে প্রবেশ করা প্রযুক্তিগতভাবে প্রায় অসম্ভব।
এরপর তদন্তের পরিধি বিদ্যালয়কেন্দ্রিক করা হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর পারিবারিক পরিবেশ যাচাই করা হয়। তদন্তে শিক্ষার্থীর বাড়িতে ব্যবহৃত ব্লেডের সঙ্গে মিল থাকা একটি ব্লেডও উদ্ধার করা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণির ওই শিক্ষার্থী স্বীকার করেছে যে ব্লেডটি তার নিজের ব্যাগে ছিল। বিদ্যালয়ে ব্লেড আনা নিষিদ্ধ হওয়ায় শিক্ষক দেখে ফেললে বকাঝকা বা শাস্তির আশঙ্কায় সে ব্লেডটি রুটির মধ্যে লুকিয়ে রাখে। পরে অন্য এক শিক্ষার্থী ব্লেডটি দেখে ফেলতে পারে—এমন ভয়ে সে নিজেই শ্রেণিশিক্ষকের কাছে গিয়ে রুটির মধ্যে ব্লেড পাওয়ার দাবি করে।
তদন্তে আরও উল্লেখ করা হয়, অভিযোগ পাওয়ার পর সহকারী শিক্ষিকা শারমিন জাহান বিষয়টি যাচাই না করেই ব্লেডসহ রুটির ছবি তুলে শিক্ষকদের ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে পাঠিয়ে দেন। পরে সেই ছবি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় কোনো তদন্ত ছাড়াই ঘটনাটি দেশব্যাপী আলোচনার জন্ম দেয় এবং বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।
ইউএনও মো. ইব্রাহীম বলেন, তদন্ত কমিটি মাত্র তিন দিনের মধ্যে সাক্ষ্য-প্রমাণ, তথ্য-উপাত্ত ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যকে নির্ভুল ও তথ্যনির্ভর বলে প্রশাসনের বিশ্বাস।
এদিকে, রুটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আইল্যান্ড ট্রেডিং করপোরেশনের প্রকল্প পরিচালক শাহ আলম খানও দাবি করেন, সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিতে রুটি উৎপাদিত হওয়ায় উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কোনো ধাতব বস্তু প্রবেশ করলে তা আগেই শনাক্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা। ফলে একটি অক্ষত ব্লেড রুটির ভেতরে থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।
বরিশাল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল বলেন, সরকারি কর্মচারী হিসেবে কোনো তথ্য যাচাই ছাড়া তা প্রচার করা দায়িত্বশীল আচরণ নয়। এ কারণে বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট শিক্ষিকাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং বিভাগীয় ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে শিক্ষিকা শারমিন জাহানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, গত ২২ জুলাই হরিসেনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী টিফিনের সময় রুটির মধ্যে ব্লেড পাওয়ার দাবি করলে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশব্যাপী আলোচনার জন্ম দেয়। পরবর্তীতে উপজেলা প্রশাসনের তদন্তে ঘটনার ভিন্ন চিত্র উঠে আসায় বহুল আলোচিত এ ঘটনায় নতুন মোড় সৃষ্টি হয়েছে।
Reporter Name 




















