ঢাকা ০৬:৫৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
পবিপ্রবিতে যথাযোগ্য মর্যাদায় জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালিত গোয়াইনঘাট থানা সদরের প্রথম- ‘স্ট্রাইকার জোন ফুটসাল ইনডোরের’ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন পাথরঘাটায় ২১ বছরের বিবাহিত আসামিকে চার্জশিটে ১৬ বছরের শিশু দেখানোর অভিযোগ গোয়াইনঘাটের চৌধুরী বিলে রাতের আঁধারে বিষ প্রয়োগ,ক্ষতির মুখে দুই মাছ চাষি আমতলীতে মকবুল খানের গনসংযোগে বাঁধভাঙা জনস্রোত আমতলীতে ৪৭০০ পিস ইয়াবাসহ স্বামী-স্ত্রী গ্রেপ্তার,পলাতক জামাতা চুনারুঘাটে একাধিক মামলার আসামি জাহির-রাজু প্রকাশ্যে, গ্রেপ্তার নিয়ে প্রশ্ন বাকেরগঞ্জে নারী দিয়ে ‘মব’ ছাত্রদল নেতাকে ফাঁসানোর অভিযোগ দুমকির গৃহবধূকে কুপিয়ে জখমের মামলায় প্রধান আসামি শাকিল ফকির আটক কলাপাড়ায় কবিরাজের বিরুদ্ধে কিশোরীকে ধর্ষণ ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ, গ্রেপ্তার

দেনমোহর আদায়ে তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে হবে না: হাইকোর্ট

  • Reporter Name
  • Update Time : ১১:২৭:২৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
  • ৫৪ Time View

 

ইমরান হোসেন

দেনমোহর স্ত্রীর স্বতন্ত্র আর্থিক অধিকার এবং এটি স্বামীর ওপর বিবাহের মাধ্যমে সৃষ্ট আইনগত দায়। স্ত্রীকে তাঁর দেনমোহর পাওয়ার জন্য তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। বিশেষ করে ‘prompt dower’ বা তাৎক্ষণিক দেনমোহর স্ত্রী বিবাহিত থাকা অবস্থায়ও দাবি ও আদায় করতে পারেন বলে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

‘ইয়াকুব আলী বনাম সানজিদা নাসরিন’ মামলায় এই রায় দেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি আবদুর রহমান। Civil Revision No. 5219 of 2024 মামলায় গত ৩ সেপ্টেম্বর রায় দেওয়া হয়। ৩২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি ৬ অক্টোবর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।

রায়ে আদালত বলেন, শুধু নিকাহনামায় দেনমোহরের দায় উল্লেখ রয়েছে—এই কারণে স্ত্রীকে দেনমোহর পাওয়ার জন্য তালাক কিংবা স্বামীর মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। আদালতের ভাষায়, “the wife must not wait until divorce or death to get the dower.”

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ‘prompt dower’ স্বামীর ওপর স্ত্রীর একটি ঋণ বা পাওনা (debt)। এটি একটি অনিরাপদ ঋণ (unsecured debt) এবং আইনগতভাবে আদায়যোগ্য পাওনা (actionable claim)। ফলে স্ত্রী তাঁর প্রাপ্য দেনমোহর আদায়ের জন্য আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন।

আদালত আরও বলেন, নিকাহনামায় দেনমোহরের ধরন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ২০০৯ সালের Muslim Marriages and Divorces (Registration) Rules-এর নির্ধারিত ফরমে দেনমোহরের মোট পরিমাণ, prompt/deferred dower এবং ইতোমধ্যে পরিশোধিত অর্থের জন্য পৃথক ঘর রয়েছে। তবে কনের সম্মতি ছাড়া কোনো দেনমোহরকে শুধু ‘deferred’ হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হলে, স্ত্রী দাবি করার পর সেটি prompt dower হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে আদালত মত দিয়েছেন।

মামলাটির প্রেক্ষাপটে স্বামী আর্থিক সংকটের কথা তুলে দেনমোহরের অর্থ কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ চেয়েছিলেন। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, শুধু আর্থিক সংকট দেখিয়ে স্বামী দেনমোহর পরিশোধের আইনগত দায় থেকে মুক্তি পেতে পারেন না। তবে প্রকৃত আর্থিক অসচ্ছলতা প্রমাণিত হলে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় আদালত কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দিতে পারে।

হাইকোর্ট আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি রায় দিয়েছেন, কোনো স্বামীর দেনমোহর পরিশোধের আর্থিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে তা বিলম্ব করেন এবং দেনমোহর আদায়ের জন্য স্ত্রীকে আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়, তাহলে মামলার সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিচারিক আদালত স্ত্রীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।

মামলার নথি ও সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দম্পতির বিয়ে হয় ২০১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর। তাদের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। তাঁদের দেনমোহর নির্ধারিত ছিল ২২ লাখ টাকা। পরবর্তী সময়ে পারিবারিক বিরোধের জেরে বিচ্ছেদ ঘটে।

স্ত্রী দেনমোহর ও সন্তানের ভরণপোষণ আদায়ের জন্য চট্টগ্রামের পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করেন। স্বামী আদালতে হাজির না হওয়ায় ২০২২ সালের ৫ মে একতরফা ডিক্রি দেওয়া হয়। এতে স্ত্রীকে ১৮ লাখ টাকা দেনমোহর, ইদ্দতকালীন তিন মাসের ভরণপোষণ বাবদ ৩০ হাজার টাকা এবং কন্যাসন্তানের বকেয়া ভরণপোষণ বাবদ ২ লাখ ১০ হাজার টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। মোট ডিক্রির অর্থ দাঁড়ায় ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকা। পাশাপাশি সন্তানের বিয়ের আগ পর্যন্ত মাসিক ৭ হাজার টাকা ভরণপোষণের নির্দেশও দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে স্বামী ডিক্রি বাতিল ও আপিলের চেষ্টা করেও সফল হননি। ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট তাঁর আপিল খারিজ হওয়ার পর তিনি হাইকোর্টে রিভিশন মামলা করেন। ওই মামলার রায়েই দেনমোহরের প্রকৃতি ও স্ত্রীর অধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই রায় আসে।

হাইকোর্টের এই রায়ের মূল বক্তব্য হলো—দেনমোহর কোনো অনুগ্রহ বা স্বামীর ইচ্ছাধীন অর্থ নয়; এটি স্ত্রীর আইনগত আর্থিক অধিকার। বিশেষ করে prompt dower-এর ক্ষেত্রে স্ত্রী বিবাহিত থাকা অবস্থায়ও তা দাবি করতে পারেন এবং প্রয়োজনে আদালতের মাধ্যমে আদায় করতে পারেন।

এই রায়ের ফলে বিবাহিত নারীদের দেনমোহর সম্পর্কে আইনগত অধিকার ও সচেতনতা বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেনমোহরকে বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে নয়, বরং স্ত্রীর আইনগত ও আর্থিক অধিকার হিসেবে দেখার বিষয়টি রায়ে নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post
Classic Software Technology

পবিপ্রবিতে যথাযোগ্য মর্যাদায় জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালিত

দেনমোহর আদায়ে তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে হবে না: হাইকোর্ট

Update Time : ১১:২৭:২৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

 

ইমরান হোসেন

দেনমোহর স্ত্রীর স্বতন্ত্র আর্থিক অধিকার এবং এটি স্বামীর ওপর বিবাহের মাধ্যমে সৃষ্ট আইনগত দায়। স্ত্রীকে তাঁর দেনমোহর পাওয়ার জন্য তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। বিশেষ করে ‘prompt dower’ বা তাৎক্ষণিক দেনমোহর স্ত্রী বিবাহিত থাকা অবস্থায়ও দাবি ও আদায় করতে পারেন বলে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

‘ইয়াকুব আলী বনাম সানজিদা নাসরিন’ মামলায় এই রায় দেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি আবদুর রহমান। Civil Revision No. 5219 of 2024 মামলায় গত ৩ সেপ্টেম্বর রায় দেওয়া হয়। ৩২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি ৬ অক্টোবর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।

রায়ে আদালত বলেন, শুধু নিকাহনামায় দেনমোহরের দায় উল্লেখ রয়েছে—এই কারণে স্ত্রীকে দেনমোহর পাওয়ার জন্য তালাক কিংবা স্বামীর মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। আদালতের ভাষায়, “the wife must not wait until divorce or death to get the dower.”

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ‘prompt dower’ স্বামীর ওপর স্ত্রীর একটি ঋণ বা পাওনা (debt)। এটি একটি অনিরাপদ ঋণ (unsecured debt) এবং আইনগতভাবে আদায়যোগ্য পাওনা (actionable claim)। ফলে স্ত্রী তাঁর প্রাপ্য দেনমোহর আদায়ের জন্য আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন।

আদালত আরও বলেন, নিকাহনামায় দেনমোহরের ধরন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ২০০৯ সালের Muslim Marriages and Divorces (Registration) Rules-এর নির্ধারিত ফরমে দেনমোহরের মোট পরিমাণ, prompt/deferred dower এবং ইতোমধ্যে পরিশোধিত অর্থের জন্য পৃথক ঘর রয়েছে। তবে কনের সম্মতি ছাড়া কোনো দেনমোহরকে শুধু ‘deferred’ হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হলে, স্ত্রী দাবি করার পর সেটি prompt dower হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে আদালত মত দিয়েছেন।

মামলাটির প্রেক্ষাপটে স্বামী আর্থিক সংকটের কথা তুলে দেনমোহরের অর্থ কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ চেয়েছিলেন। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, শুধু আর্থিক সংকট দেখিয়ে স্বামী দেনমোহর পরিশোধের আইনগত দায় থেকে মুক্তি পেতে পারেন না। তবে প্রকৃত আর্থিক অসচ্ছলতা প্রমাণিত হলে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় আদালত কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দিতে পারে।

হাইকোর্ট আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি রায় দিয়েছেন, কোনো স্বামীর দেনমোহর পরিশোধের আর্থিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে তা বিলম্ব করেন এবং দেনমোহর আদায়ের জন্য স্ত্রীকে আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়, তাহলে মামলার সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিচারিক আদালত স্ত্রীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।

মামলার নথি ও সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দম্পতির বিয়ে হয় ২০১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর। তাদের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। তাঁদের দেনমোহর নির্ধারিত ছিল ২২ লাখ টাকা। পরবর্তী সময়ে পারিবারিক বিরোধের জেরে বিচ্ছেদ ঘটে।

স্ত্রী দেনমোহর ও সন্তানের ভরণপোষণ আদায়ের জন্য চট্টগ্রামের পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করেন। স্বামী আদালতে হাজির না হওয়ায় ২০২২ সালের ৫ মে একতরফা ডিক্রি দেওয়া হয়। এতে স্ত্রীকে ১৮ লাখ টাকা দেনমোহর, ইদ্দতকালীন তিন মাসের ভরণপোষণ বাবদ ৩০ হাজার টাকা এবং কন্যাসন্তানের বকেয়া ভরণপোষণ বাবদ ২ লাখ ১০ হাজার টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। মোট ডিক্রির অর্থ দাঁড়ায় ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকা। পাশাপাশি সন্তানের বিয়ের আগ পর্যন্ত মাসিক ৭ হাজার টাকা ভরণপোষণের নির্দেশও দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে স্বামী ডিক্রি বাতিল ও আপিলের চেষ্টা করেও সফল হননি। ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট তাঁর আপিল খারিজ হওয়ার পর তিনি হাইকোর্টে রিভিশন মামলা করেন। ওই মামলার রায়েই দেনমোহরের প্রকৃতি ও স্ত্রীর অধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই রায় আসে।

হাইকোর্টের এই রায়ের মূল বক্তব্য হলো—দেনমোহর কোনো অনুগ্রহ বা স্বামীর ইচ্ছাধীন অর্থ নয়; এটি স্ত্রীর আইনগত আর্থিক অধিকার। বিশেষ করে prompt dower-এর ক্ষেত্রে স্ত্রী বিবাহিত থাকা অবস্থায়ও তা দাবি করতে পারেন এবং প্রয়োজনে আদালতের মাধ্যমে আদায় করতে পারেন।

এই রায়ের ফলে বিবাহিত নারীদের দেনমোহর সম্পর্কে আইনগত অধিকার ও সচেতনতা বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেনমোহরকে বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে নয়, বরং স্ত্রীর আইনগত ও আর্থিক অধিকার হিসেবে দেখার বিষয়টি রায়ে নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রিন্ট করুন :