পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে চক্রবৃদ্ধি সুদে ঋণ দেওয়ার মহাজনি প্রথা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, চিকিৎসা, কৃষিকাজ, ব্যবসা কিংবা পারিবারিক প্রয়োজনে অনেক অসচ্ছল পরিবার চড়া সুদে ঋণ নিয়ে পরে সুদের চাপে চরম আর্থিক সংকটে পড়ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের সহজলভ্যতা না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে চক্রবৃদ্ধি সুদের কারণে দেনার পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যায়। ফলে দীর্ঘদিন ঋণের বোঝা বহন করতে হয় অনেক পরিবারকে। কেউ কেউ সহায়-সম্পদ বিক্রি করেও ঋণের দায় থেকে মুক্তি পান না বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, অভিযোগ রয়েছে, উপজেলার মুরাদিয়া ইউনিয়নের একটি মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে ব্ল্যাংক চেক রেখে চড়া সুদে টাকা লেনদেনের ঘটনায় এক শিক্ষককে একসময় আত্মগোপনে থাকতে হয়েছিল।
এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, উপজেলার বিভিন্ন মাদ্রাসায় ধান করালি, চাল করালি কিংবা নগদ অর্থের বিনিময়ে উচ্চ সুদে মহাজনি কারবার পরিচালিত হয়ে আসছে।
স্থানীয়দের দাবি, ব্যক্তিগতভাবে উপজেলার কিছু স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীও এ ধরনের সুদভিত্তিক ঋণ লেনদেনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি এবং স্বাধীনভাবে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
গত এক দশকে ঋণের চাপ, আর্থিক সংকট ও আর্থিক প্রতারণাকে ঘিরে দুমকীতে একাধিক মর্মান্তিক ঘটনা স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
২১ মে ২০২৬ দুমকির শ্রীরামপুর এলাকার মাদ্রাসাশিক্ষক আবুল কালাম আজাদের আত্মহত্যার ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাঁর রেখে যাওয়া চিরকুট, আর্থিক লেনদেন ও প্রতারণার অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, তিনি ঋণের চাপেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। অপর একটি অংশের দাবি, তিনি কথিত “ম্যাগনেটিক পিলার” সংশ্লিষ্ট একটি প্রতারণামূলক চক্রের আর্থিক লেনদেনে জড়িয়ে ঋণের বোঝায় পড়েছিলেন। তবে তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে ঋণের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক কিংবা এসব দাবির সত্যতা এখনো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে চলমান।
২ জুলাই ২০২৬ তারিখের একটি প্রতিবেদনে স্থানীয় জেলেদের মহাজনি দাদন এবং বিভিন্ন এনজিওর ঋণের কিস্তি পরিশোধ নিয়ে উদ্বেগ ও হতাশার চিত্র তুলে ধরা হয়।
৩০ নভেম্বর, ২০২৫ তারিখে এনজিওর ঋণের কিস্তির চাপ সইতে না পেরে উপজেলার আঙ্গারিয়া ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত মজিবুর রহমান খানের ছেলে ও পীরতলা বাজারের ‘জিহাদ স্টোর’র মালিক ইলিয়াস নিজ ঘরে গলায় ফাঁস দিয়ে তিনি আত্মহত্যা করেন।
২৬ আগস্ট ২০২৩ তারিখে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আঙ্গারিয়া ইউনিয়নের সাতানি গ্রামের মামুন মৃধার আত্মহত্যার ঘটনা উঠে আসে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন কাজ না থাকা ও ধারদেনার চাপে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন।
২৭ আগস্ট ২০২০ প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে চরগরবদী গ্রামের কাইয়ুম সিকদারের আত্মহত্যার তথ্য প্রকাশিত হয়। পরিবারের দাবি ছিল, দীর্ঘদিন দেনাগ্রস্ত থাকা এবং পাওনাদারদের চাপের কারণে তিনি হতাশায় ভুগছিলেন।
এরও আগে ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ দ্য ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে “জয়েন্ট সেভিংস অ্যান্ড ক্রেডিট কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড”-এর বিরুদ্ধে আমানতকারীদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দুমকিসহ বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের বহু মানুষের কাছ থেকে সঞ্চয় সংগ্রহের পর প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলে, যার ফলে অসংখ্য আমানতকারী আর্থিক ক্ষতির শিকার হন।
সচেতন মহলের মতে, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ সুদের ঋণব্যবস্থা, আর্থিক প্রতারণা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের সীমিত সুযোগ গ্রামীণ অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তাঁদের মতে, বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি, অবৈধ সুদের কারবারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা, আর্থিক প্রতারণার তদন্ত এবং দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সহজ শর্তে বৈধ ঋণের সুযোগ সম্প্রসারণসহ ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করে সচেতন করা সময়ের দাবি।
মোঃ রিয়াজুল ইসলাম 























