ঢাকা ০৮:৩৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
দুমকিতে ব্র্যাকের ‘ভাসমান শিক্ষা তরী’ পরিদর্শন ও শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ বরগুনায় মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতে অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ সবুজ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে বরিশালে আনসার-ভিডিপির বৃক্ষরোপণ অভিযান ও চারা বিতরণ  পটুয়াখালীতে বিএনপির সমাবেশ-মিছিল, সন্ত্রাস-নৈরাজ্য প্রতিহতের ঘোষণা রিজভীকে পবিপ্রবি জিয়া পরিষদের শুভেচ্ছা দুমকীতে শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে আটক দেলোয়ার খান ‎ ‎ মহিপুরে আপন বোনসহ চার শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে কিশোর গ্রেপ্তার জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ, লিটার প্রতি দাম বাড়ল ২০ টাকা পবিপ্রবির নেতৃত্বে জিএসটি ভর্তি পরীক্ষা, প্রস্তুতি নিয়ে মতবিনিময় পটুয়াখালীতে বাস-ইজিবাইকের সংঘর্ষে নিহত ৪

মুক্তিযোদ্ধা কোটায় জালিয়াতি! চবিতে চাচাকে ‘বাবা’, চাচিকে ‘মা’ বানিয়ে ভর্তি, ছাত্রত্ব বাতিলের পথে

সরোয়ার মাহমুদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে||

চাচা হলেন ‘বাবা’, চাচি হলেন ‘মা’। সেই ‘ছায়া পরিবার’ দিয়েই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) আইন বিভাগে জায়গা করে নিয়েছিলেন মাহমুদুল হাসান চৌধুরী শিমুল। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ভর্তির সেই গল্প এখন রূপ নিয়েছে জালিয়াতির অভিযোগে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, ছাত্রত্ব বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

কীভাবে শুরু হলো কেলেঙ্কারি? ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় সাধারণ মেধা তালিকায় ৪৬৫৩তম অবস্থানে ছিলেন শিমুল। সেই অবস্থান থেকে চবির মতো প্রতিষ্ঠানে আইন বিভাগে ভর্তির সুযোগ ছিল না। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা কোটায় (FFQ1) মেধা তালিকায় উঠে এলেন ৩৮তম স্থানে।

গোপন ছিল এক জাল পরিচয়—ভর্তি ফর্মে জন্মদাতা পিতা এমদাদুল ইসলাম চৌধুরীর নাম বদলে চাচা মফিজুল ইসলাম চৌধুরীকে ‘পিতা’ বানিয়ে দেন শিমুল। মায়ের জায়গায় দেন চাচি সামসুন্নাহারের নাম। একইসঙ্গে পেশ করেন জাতীয় পরিচয়পত্র ও একাডেমিক কাগজপত্র—সবই ছায়া পরিচয়ে তৈরি।

প্রশাসনের অবস্থানঃ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন,“তদন্ত শেষে বিষয়টি বোর্ড অফ ডিসিপ্লিনে পাঠানো হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ছাত্রত্ব বাতিলসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

প্রক্টর অধ্যাপক ড. তানভীর মোহাম্মদ হায়দার আরিফ জানালেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি ডিসিপ্লিনারি বোর্ডে উত্থাপন করা হবে। জালিয়াতি প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা অবশ্যম্ভাবী।”

■ কেবল শিমুলই নয়? বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং স্থানীয় সূত্রের দাবি, শিমুলের আরও একাধিক ভাই-বোন একই কৌশলে মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধা নিয়ে সরকারি চাকরি বাগিয়ে নিয়েছেন। ফলে, এটি একটি পারিবারিক ষড়যন্ত্র হিসেবেও দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষয়টি ভাইরাল হতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছে ছাত্রসমাজ।

এক শিক্ষার্থী ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন,“এভাবে কেউ মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুযোগ নিয়ে আইন বিভাগে পড়বে, আর প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কোটা থাকা সত্ত্বেও বাদ পড়ে যাবে—এটা মেনে নেওয়া যায় না।”

শিমুল কী বলছেন? বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা শিমুল নিজেই স্বীকার করেছেন,“আমি ছোটবেলায় থেকেই ওই কাগজপত্রে চাচাকে বাবা হিসেবে ব্যবহার করেছি—এটা পারিবারিক সিদ্ধান্ত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময়ও তাই করেছি। তবে এখন বুঝতে পারছি এটি ভুল ছিল। আমি অনুতপ্ত।”

গেজেট অনুযায়ী তথ্য কী বলছে? জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের গেজেট অনুযায়ী, হবিগঞ্জ জেলার লাখাই উপজেলার মুড়িয়াউক গ্রামের মফিজুল ইসলাম চৌধুরী একজন স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধা। তবে তিনি শিমুলের জন্মদাতা নন, চাচা। শিমুলের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করা বিভিন্ন ছবিতেও তার প্রকৃত বাবার (এমদাদুল ইসলাম চৌধুরী) সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রমাণ রয়েছে।

■ কী হতে পারে শাস্তি? বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অফ রেসিডেন্স, হেলথ অ্যান্ড ডিসিপ্লিন সূত্র জানায়, পরবর্তী বৈঠকে বিষয়টি চূড়ান্তভাবে তোলা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে শিমুলের ছাত্রত্ব বাতিল হতে পারে, এমনকি ফৌজদারি মামলার আওতায়ও আনা হতে পারে।

■ মুক্তিযোদ্ধা কোটা দেশের ইতিহাস ও আত্মত্যাগের প্রতীক। সেই কোটাকে জালিয়াতির হাতিয়ার বানিয়ে কেউ যদি মেধার সঙ্গে প্রতারণা করে, তবে তা শুধু আইন নয়—নৈতিকতার দিক থেকেও চরম লঙ্ঘন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Md. Riajul Islam

Popular Post
Classic Software Technology

দুমকিতে ব্র্যাকের ‘ভাসমান শিক্ষা তরী’ পরিদর্শন ও শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ

মুক্তিযোদ্ধা কোটায় জালিয়াতি! চবিতে চাচাকে ‘বাবা’, চাচিকে ‘মা’ বানিয়ে ভর্তি, ছাত্রত্ব বাতিলের পথে

Update Time : ১১:৫৪:২৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ জুন ২০২৫

সরোয়ার মাহমুদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে||

চাচা হলেন ‘বাবা’, চাচি হলেন ‘মা’। সেই ‘ছায়া পরিবার’ দিয়েই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) আইন বিভাগে জায়গা করে নিয়েছিলেন মাহমুদুল হাসান চৌধুরী শিমুল। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ভর্তির সেই গল্প এখন রূপ নিয়েছে জালিয়াতির অভিযোগে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, ছাত্রত্ব বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

কীভাবে শুরু হলো কেলেঙ্কারি? ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় সাধারণ মেধা তালিকায় ৪৬৫৩তম অবস্থানে ছিলেন শিমুল। সেই অবস্থান থেকে চবির মতো প্রতিষ্ঠানে আইন বিভাগে ভর্তির সুযোগ ছিল না। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা কোটায় (FFQ1) মেধা তালিকায় উঠে এলেন ৩৮তম স্থানে।

গোপন ছিল এক জাল পরিচয়—ভর্তি ফর্মে জন্মদাতা পিতা এমদাদুল ইসলাম চৌধুরীর নাম বদলে চাচা মফিজুল ইসলাম চৌধুরীকে ‘পিতা’ বানিয়ে দেন শিমুল। মায়ের জায়গায় দেন চাচি সামসুন্নাহারের নাম। একইসঙ্গে পেশ করেন জাতীয় পরিচয়পত্র ও একাডেমিক কাগজপত্র—সবই ছায়া পরিচয়ে তৈরি।

প্রশাসনের অবস্থানঃ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন,“তদন্ত শেষে বিষয়টি বোর্ড অফ ডিসিপ্লিনে পাঠানো হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ছাত্রত্ব বাতিলসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

প্রক্টর অধ্যাপক ড. তানভীর মোহাম্মদ হায়দার আরিফ জানালেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি ডিসিপ্লিনারি বোর্ডে উত্থাপন করা হবে। জালিয়াতি প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা অবশ্যম্ভাবী।”

■ কেবল শিমুলই নয়? বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং স্থানীয় সূত্রের দাবি, শিমুলের আরও একাধিক ভাই-বোন একই কৌশলে মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধা নিয়ে সরকারি চাকরি বাগিয়ে নিয়েছেন। ফলে, এটি একটি পারিবারিক ষড়যন্ত্র হিসেবেও দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষয়টি ভাইরাল হতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছে ছাত্রসমাজ।

এক শিক্ষার্থী ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন,“এভাবে কেউ মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুযোগ নিয়ে আইন বিভাগে পড়বে, আর প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কোটা থাকা সত্ত্বেও বাদ পড়ে যাবে—এটা মেনে নেওয়া যায় না।”

শিমুল কী বলছেন? বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা শিমুল নিজেই স্বীকার করেছেন,“আমি ছোটবেলায় থেকেই ওই কাগজপত্রে চাচাকে বাবা হিসেবে ব্যবহার করেছি—এটা পারিবারিক সিদ্ধান্ত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময়ও তাই করেছি। তবে এখন বুঝতে পারছি এটি ভুল ছিল। আমি অনুতপ্ত।”

গেজেট অনুযায়ী তথ্য কী বলছে? জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের গেজেট অনুযায়ী, হবিগঞ্জ জেলার লাখাই উপজেলার মুড়িয়াউক গ্রামের মফিজুল ইসলাম চৌধুরী একজন স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধা। তবে তিনি শিমুলের জন্মদাতা নন, চাচা। শিমুলের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করা বিভিন্ন ছবিতেও তার প্রকৃত বাবার (এমদাদুল ইসলাম চৌধুরী) সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রমাণ রয়েছে।

■ কী হতে পারে শাস্তি? বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অফ রেসিডেন্স, হেলথ অ্যান্ড ডিসিপ্লিন সূত্র জানায়, পরবর্তী বৈঠকে বিষয়টি চূড়ান্তভাবে তোলা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে শিমুলের ছাত্রত্ব বাতিল হতে পারে, এমনকি ফৌজদারি মামলার আওতায়ও আনা হতে পারে।

■ মুক্তিযোদ্ধা কোটা দেশের ইতিহাস ও আত্মত্যাগের প্রতীক। সেই কোটাকে জালিয়াতির হাতিয়ার বানিয়ে কেউ যদি মেধার সঙ্গে প্রতারণা করে, তবে তা শুধু আইন নয়—নৈতিকতার দিক থেকেও চরম লঙ্ঘন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রিন্ট করুন :