ঢাকা ০৮:৫২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
দুমকিতে ব্র্যাকের ‘ভাসমান শিক্ষা তরী’ পরিদর্শন ও শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ বরগুনায় মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতে অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ সবুজ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে বরিশালে আনসার-ভিডিপির বৃক্ষরোপণ অভিযান ও চারা বিতরণ  পটুয়াখালীতে বিএনপির সমাবেশ-মিছিল, সন্ত্রাস-নৈরাজ্য প্রতিহতের ঘোষণা রিজভীকে পবিপ্রবি জিয়া পরিষদের শুভেচ্ছা দুমকীতে শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে আটক দেলোয়ার খান ‎ ‎ মহিপুরে আপন বোনসহ চার শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে কিশোর গ্রেপ্তার জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ, লিটার প্রতি দাম বাড়ল ২০ টাকা পবিপ্রবির নেতৃত্বে জিএসটি ভর্তি পরীক্ষা, প্রস্তুতি নিয়ে মতবিনিময় পটুয়াখালীতে বাস-ইজিবাইকের সংঘর্ষে নিহত ৪

একটি গুলি কেড়ে নিল গলাচিপার রুবেলকে

সঞ্জিব দাস, গলাচিপা, পটুয়াখালী||

১৯ জুলাই। দিনটি অন্যরকম হয়ে আছে গলাচিপার এক পরিবারের জীবনে। সময়ের পরিক্রমায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও থামেনি কান্না। স্তব্ধ হয়ে যাওয়া স্বপ্নের আর্তনাদ এখনও প্রতিধ্বনিত হয় পানপট্টির আকাশে-বাতাসে।

দেড় বছরের ছোট্ট মেয়েটি—আলিসবা ইসলাম ফারিস্তা—আজও বাবাকে খোঁজে। জানে না, বুঝে উঠতে পারেনি—তার বাবা রুবেল আর কখনও ফিরবেন না।

২০২৪ সালের এই দিনেই ঢাকার মিরপুর-১০ চত্বরে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার মো. আতিকুল ইসলাম রুবেল (৩৫)। কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ছুটে আসা একটি গুলি থামিয়ে দেয় তার জীবনযাত্রা। হাসপাতালে নেওয়া হলেও বাঁচানো যায়নি।

পরদিন, শোকে ভারাক্রান্ত এক গ্রাম বরণ করে নেয় রুবেলের নিথর দেহ। প্রথম জানাজা হয় গলাচিপা জৈনপুরী খানকায়, দ্বিতীয়টি তার নিজের গ্রাম গ্রামার্দনে। এরপর তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় পারিবারিক কবরস্থানে।

আজ তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। পরিবারের আয়োজনে রয়েছে দোয়া ও মিলাদ।

রুবেল—একটি পরিবারের আলো

১৯৯১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন আতিকুল ইসলাম রুবেল। গলাচিপা উপজেলার পানপট্টি ইউনিয়নের গ্রামার্দন গ্রামের শাহ আলম হাওলাদারের চার সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছিলেন। এসএসসি, ডিপ্লোমা আর বিএসসি—সবই টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। স্বপ্ন ছিল বড় কিছু করার।

রাজধানীর বারিধারায় একটি বায়িং হাউজে সিনিয়র মার্চেন্ডাইজার পদে কর্মরত ছিলেন। পরিশ্রমের টাকায় গড়ে তোলেন নিজের বাড়ি—গলাচিপা পৌরসভার রূপনগরে। স্বপ্নের সেই বাড়ি, যেখানে তিনি ছিলেন মাত্র কিছুদিন।

২০১৭ সালে বিয়ে হয় রাঙ্গাবালীর মেয়ে মোসা. তামান্নার সঙ্গে। তাঁদের কোল জুড়ে আসে ছোট্ট আলিসবা। কিন্তু ২০২৪ সালের সেই ভয়াল বিকেল কেঁড়ে নেয় সবকিছু।

দায়িত্বশীল রুবেল, অসহায় পরিবার

বাবা শাহ আলম ছিলেন একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, অল্প বেতনে চলত সংসার। মেধাবী রুবেলের দায়িত্ব নেন বড় বোন লিপি ও ভাই শামীম। সেই রুবেলই এক সময় হয়ে ওঠেন পরিবারের প্রধান অবলম্বন।

তার আয়েই চলত পরিবারের খরচ। এমনকি বাকপ্রতিবন্ধী ভাইয়ের সেবাতেও তিনি ছিলেন নিরলস। এক রুবেলের উপার্জনে বেঁচে ছিল একাধিক সংসার। তাঁর মৃত্যু শুধু একটি প্রাণের নয়, একাধিক জীবনের বেঁচে থাকার সম্ভাবনারও মৃত্যু।

একটি শোক, আরেকটি মৃত্যুর কারণ

ছেলের শোকে যেন দিন গুনছিলেন বাবা শাহ আলম হাওলাদার। মাত্র এক বছরের মাথায়—২০২৫ সালের ২৭ জুন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনিও মারা যান। ছেলের শোক যেন তাকে নিঃশেষ করে দিয়েছিল।

স্ত্রীর চোখে ভেসে ওঠে শেষ মুহূর্তটি

রুবেলের স্ত্রী তামান্না বলেন,
“দুপুরে ফোন দিয়ে বলেছিল—‘বাইরে যেও না, ঝামেলা হচ্ছে।’ সেটাই ছিল আমাদের শেষ কথা। এরপর জানতে পারি গুলিবিদ্ধ হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে গিয়েও ফিরে পেলাম না।

ও তো কোনো রাজনীতি করত না। তবু কেন মরল? কে নেবে এর দায়? এখন আমার মেয়েটা বাবাকে খোঁজে। আমি কী করে বুঝাই তাকে?”

মায়ের কণ্ঠে হাহাকার

রুবেলের মা মমতাজ বেগম বলেন, “আমার ছেলে রাজনীতি করত না, কারও ক্ষতি করত না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করত, পরিবারের কথা ভাবত। এখন আমাদের দেখবে কে?”

চাচি তাহমিনা বেগমের কথায়, “সে শুধু নিজের নয়, আমাদের সবার জন্য ভাবত। তার স্ত্রী আর মেয়ের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। সরকারের উচিত পাশে দাঁড়ানো।”

রুবেলের জীবন কোনো রাজনীতি কিংবা সংঘাতে নয়, শেষ হয় অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনায়। যার শুরু নেই, শেষ নেই—শুধু থেকে গেছে একটি প্রশ্ন:
একটি নিরীহ প্রাণের মূল্য কি কেবল সংখ্যার মধ্যে হিসেব হবে?

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Md. Riajul Islam

Popular Post
Classic Software Technology

দুমকিতে ব্র্যাকের ‘ভাসমান শিক্ষা তরী’ পরিদর্শন ও শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ

একটি গুলি কেড়ে নিল গলাচিপার রুবেলকে

Update Time : ১০:০৯:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ জুলাই ২০২৫

সঞ্জিব দাস, গলাচিপা, পটুয়াখালী||

১৯ জুলাই। দিনটি অন্যরকম হয়ে আছে গলাচিপার এক পরিবারের জীবনে। সময়ের পরিক্রমায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও থামেনি কান্না। স্তব্ধ হয়ে যাওয়া স্বপ্নের আর্তনাদ এখনও প্রতিধ্বনিত হয় পানপট্টির আকাশে-বাতাসে।

দেড় বছরের ছোট্ট মেয়েটি—আলিসবা ইসলাম ফারিস্তা—আজও বাবাকে খোঁজে। জানে না, বুঝে উঠতে পারেনি—তার বাবা রুবেল আর কখনও ফিরবেন না।

২০২৪ সালের এই দিনেই ঢাকার মিরপুর-১০ চত্বরে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার মো. আতিকুল ইসলাম রুবেল (৩৫)। কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ছুটে আসা একটি গুলি থামিয়ে দেয় তার জীবনযাত্রা। হাসপাতালে নেওয়া হলেও বাঁচানো যায়নি।

পরদিন, শোকে ভারাক্রান্ত এক গ্রাম বরণ করে নেয় রুবেলের নিথর দেহ। প্রথম জানাজা হয় গলাচিপা জৈনপুরী খানকায়, দ্বিতীয়টি তার নিজের গ্রাম গ্রামার্দনে। এরপর তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় পারিবারিক কবরস্থানে।

আজ তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। পরিবারের আয়োজনে রয়েছে দোয়া ও মিলাদ।

রুবেল—একটি পরিবারের আলো

১৯৯১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন আতিকুল ইসলাম রুবেল। গলাচিপা উপজেলার পানপট্টি ইউনিয়নের গ্রামার্দন গ্রামের শাহ আলম হাওলাদারের চার সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছিলেন। এসএসসি, ডিপ্লোমা আর বিএসসি—সবই টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। স্বপ্ন ছিল বড় কিছু করার।

রাজধানীর বারিধারায় একটি বায়িং হাউজে সিনিয়র মার্চেন্ডাইজার পদে কর্মরত ছিলেন। পরিশ্রমের টাকায় গড়ে তোলেন নিজের বাড়ি—গলাচিপা পৌরসভার রূপনগরে। স্বপ্নের সেই বাড়ি, যেখানে তিনি ছিলেন মাত্র কিছুদিন।

২০১৭ সালে বিয়ে হয় রাঙ্গাবালীর মেয়ে মোসা. তামান্নার সঙ্গে। তাঁদের কোল জুড়ে আসে ছোট্ট আলিসবা। কিন্তু ২০২৪ সালের সেই ভয়াল বিকেল কেঁড়ে নেয় সবকিছু।

দায়িত্বশীল রুবেল, অসহায় পরিবার

বাবা শাহ আলম ছিলেন একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, অল্প বেতনে চলত সংসার। মেধাবী রুবেলের দায়িত্ব নেন বড় বোন লিপি ও ভাই শামীম। সেই রুবেলই এক সময় হয়ে ওঠেন পরিবারের প্রধান অবলম্বন।

তার আয়েই চলত পরিবারের খরচ। এমনকি বাকপ্রতিবন্ধী ভাইয়ের সেবাতেও তিনি ছিলেন নিরলস। এক রুবেলের উপার্জনে বেঁচে ছিল একাধিক সংসার। তাঁর মৃত্যু শুধু একটি প্রাণের নয়, একাধিক জীবনের বেঁচে থাকার সম্ভাবনারও মৃত্যু।

একটি শোক, আরেকটি মৃত্যুর কারণ

ছেলের শোকে যেন দিন গুনছিলেন বাবা শাহ আলম হাওলাদার। মাত্র এক বছরের মাথায়—২০২৫ সালের ২৭ জুন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনিও মারা যান। ছেলের শোক যেন তাকে নিঃশেষ করে দিয়েছিল।

স্ত্রীর চোখে ভেসে ওঠে শেষ মুহূর্তটি

রুবেলের স্ত্রী তামান্না বলেন,
“দুপুরে ফোন দিয়ে বলেছিল—‘বাইরে যেও না, ঝামেলা হচ্ছে।’ সেটাই ছিল আমাদের শেষ কথা। এরপর জানতে পারি গুলিবিদ্ধ হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে গিয়েও ফিরে পেলাম না।

ও তো কোনো রাজনীতি করত না। তবু কেন মরল? কে নেবে এর দায়? এখন আমার মেয়েটা বাবাকে খোঁজে। আমি কী করে বুঝাই তাকে?”

মায়ের কণ্ঠে হাহাকার

রুবেলের মা মমতাজ বেগম বলেন, “আমার ছেলে রাজনীতি করত না, কারও ক্ষতি করত না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করত, পরিবারের কথা ভাবত। এখন আমাদের দেখবে কে?”

চাচি তাহমিনা বেগমের কথায়, “সে শুধু নিজের নয়, আমাদের সবার জন্য ভাবত। তার স্ত্রী আর মেয়ের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। সরকারের উচিত পাশে দাঁড়ানো।”

রুবেলের জীবন কোনো রাজনীতি কিংবা সংঘাতে নয়, শেষ হয় অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনায়। যার শুরু নেই, শেষ নেই—শুধু থেকে গেছে একটি প্রশ্ন:
একটি নিরীহ প্রাণের মূল্য কি কেবল সংখ্যার মধ্যে হিসেব হবে?

প্রিন্ট করুন :