দুমকি প্রতিনিধিঃ মা ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে সরকারের ঘোষিত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। কিন্তু পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলায় নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পায়রা ও পাণ্ডব নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে মা ইলিশ শিকারের অভিযোগ উঠেছে। নদীতে একের পর এক মাছ ধরার নৌকা, জাল ফেলে নির্বিঘ্নে মাছ শিকার এবং প্রশাসনের সীমিত নজরদারি—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, মা ইলিশ রক্ষায় মাঠপর্যায়ের তদারকি কতটা কার্যকর।
নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা ৭ তারিখ মধ্যরাত থেকে ২৯ অক্টোবর—এই ২২ দিন মা ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুত ও বিক্রির ওপর সরকারি বিধিনিষেধ কার্যকর রয়েছে। অথচ স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য ও সরেজমিনে দেখা দৃশ্য অনুযায়ী, দুমকির বিভিন্ন নদীপয়েন্টে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকারের কার্যক্রম চলার অভিযোগ রয়েছে। এতে মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকারের উদ্যোগ বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার পায়রা নদীর পাঙ্গাশিয়া, আলগী, লেবুখালী, আঙ্গারিয়া, জেলেবাড়ি ও বাহেরচর এলাকাসহ মুরাদিয়া এবং পাণ্ডব নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকারের অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে নদী এলাকার বিভিন্ন স্থান পরিদর্শনে গিয়ে দেখাযায়, মাছ ধরার নৌকার চলাচল ও জাল ফেলে মাছ শিকারের দৃশ্য চোখে পড়ার কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তাঁদের অভিযোগ, ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে জেলেরা নদীর বিভিন্ন অংশে মাছ শিকার করছেন। ফলে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকা সত্ত্বেও নদীতে অবৈধ মাছ ধরার তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, দিনের আলোতেই যদি নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে এভাবে মাছ শিকারের অভিযোগ থাকে, তাহলে নিয়মিত টহল ও নজরদারির কার্যকারিতা কোথায়।
নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির মধ্যেই যদি এমন ঘটনা ঘটে, তবে তা প্রতিরোধে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
কারও পেটে ক্ষুধা, কারও কাছে ২২ দিনের উৎসব
আঙ্গারিয়া ইউনিয়নের লঞ্চঘাট এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জেলে বলেন, “কেউ নামে পেটের ক্ষুধায়, কারও কাছে আবার উৎসব।” তাঁর দাবি, নিষেধাজ্ঞার সময় ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে কাজ করা কিছু ব্যক্তি বাড়িতে ফিরে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার নিয়ে মাছ শিকারে নামেন। তাঁদের কাছে এই ২২ দিন মাছ ধরার উৎসবের মতো।
অন্যদিকে, পাতাবুনিয়া জেলেবাড়ি এলাকার জেলে সুকুমার দাস বলেন, সরকার থেকে দেওয়া ২৫ কেজি চাল দিয়ে একটি পরিবারের চাহিদা পূরণ করা কঠিন। একটি পরিবারে চার থেকে পাঁচজন সদস্য থাকলে ওই চাল দিয়ে পুরো সময় চলা সম্ভব হয় না। এর ওপর এনজিওর ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপও রয়েছে। এসব কারণে কিছু জেলে জীবিকার তাগিদে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে নামছেন বলে তিনি জানান।
জেলে হান্নানের অভিযোগ, প্রকৃত জেলেদের অনেকে সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অথচ জেলে নন—এমন ব্যক্তিরাও সহায়তা পাচ্ছেন। তাঁর ভাষ্য, সহায়তা বণ্টনে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ থাকলে প্রকৃত জেলেদের দুর্ভোগ আরও বাড়ে।
তবে জীবিকার সংকট অবৈধভাবে মা ইলিশ শিকারের কারণ হিসেবে উঠে এলেও নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন এবং প্রকৃত জেলেদের সহায়তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপরই বর্তায়।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারি বায়োলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রাজিব সরকার বলেন, নদী, জেলে ও ইলিশ—এরা একই সূত্রে গাঁথা। জেলেরা যাতে পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবনযাপন করতে পারেন, সে জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি প্রকৃত জেলেদের তালিকা হালনাগাদ করে তাঁদের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছানো এবং নিষেধাজ্ঞার ২২ দিনের জন্য ঋণের কিস্তি মওকুফের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, জেলেদের জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে মা ইলিশ রক্ষায় তাঁদের সম্পৃক্ততা বাড়বে।
এ বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান জানান, তাঁদের টহল দল সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিদর্শন করেছে। সীমিত জনবল ও মাত্র একটি টহল দল থাকায় সব এলাকায় সমানভাবে নজরদারি করা কঠিন হচ্ছে। তবে টহল জোরদারের চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানান।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল্লাহ খায়রুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুধু কাগজে-কলমে কার্যকর থাকলেই চলবে না; নদীর বাস্তব পরিস্থিতিতেও এর প্রতিফলন থাকা জরুরি। নিষেধাজ্ঞা চলাকালে বিভিন্ন পয়েন্টে মাছ শিকারের অভিযোগ উঠলে তা প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান, পর্যাপ্ত জনবল, সমন্বিত টহল এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরালো হয়।
নদীতীরবর্তী সচেতন মানুষের আশঙ্কা, এভাবে মা ইলিশ শিকার অব্যাহত থাকলে ইলিশের প্রজনন ও ভবিষ্যৎ উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
পাঙ্গাশিয়া এলাকার বাসিন্দা মো. ফারুক বলেন, মা ইলিশ নিধন বন্ধ করা না গেলে একসময় নদীতে ইলিশের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই তিনি দ্রুত কঠোর ও নিয়মিত অভিযান পরিচালনার দাবি জানান।
এখন প্রশ্ন হলো, নিষেধাজ্ঞার সময় নদীতে অবৈধ মাছ শিকার বন্ধে তদারকি কতটা জোরদার করা হয়েছে, প্রকৃত জেলেদের সহায়তা কতটা নিশ্চিত হয়েছে এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? এসব প্রশ্নের কার্যকর উত্তর ও মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপই পারে মা ইলিশ রক্ষার সরকারি উদ্যোগকে সফল করতে।