মুর্শিদুল ইসলাম খান
বাগেরহাট প্রতিনিধি: বহুদিন পর বাগেরহাট পৌরসভার সড়ক উন্নয়নে কোটি কোটি টাকার কাজ শুরু হলেও নির্মাণকাজের মান ও তদারকি নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোথাও কার্পেটিং উঠে গর্ত তৈরি হয়েছে, কোথাও বৃষ্টির পানি জমছে। আবার কিছু সড়কে পুরোনো রাস্তার ওপর পর্যাপ্ত বালু-খোয়া না দিয়েই কার্পেটিং করার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের নকশা ও নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাজ হচ্ছে না। নিম্নমানের ইট ও নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের পাশাপাশি কাজের বিভিন্ন ধাপে যথাযথ মান যাচাই করা হচ্ছে না। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে স্থানীয়ভাবে ‘খোকন’ নামে পরিচিত এক ঠিকাদারের নাম উঠে এসেছে।
পৌরসভার নথি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, CTCRP প্রকল্পের আওতায় ১০টি সড়ক উন্নয়নে প্রাথমিক বরাদ্দ ছিল ৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা। পরে সংশোধিত বরাদ্দ দাঁড়ায় ৯ কোটি ১৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ ৩৪ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, টেন্ডার মেসার্স জহিরুল হক দুলাল ও কুড়িগ্রামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে হলেও বাস্তবে কয়েকটি কাজ ‘খোকন’ পরিচালনা করছেন। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মিঠাপুকুর পার মসজিদ থেকে নূর মসজিদ মোড় হয়ে এলজিইডি অফিস পর্যন্ত সড়কের কাজ প্রায় ৯৯ শতাংশ শেষ হলেও বিভিন্ন স্থানে কার্পেটিং উঠে গর্ত সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ। বাসাভাটি আমতলা স্কুল থেকে টোল অফিস হয়ে পুটিমারি ব্রিজ পর্যন্ত সড়কের সম্পন্ন অংশেও কোথাও খোয়া উঠে যাওয়া ও পানি জমে থাকার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আসাদ বলেন, কাজের সিডিউল দেখতে চাইলেও তাকে তা দেখানো হয়নি। নিম্নমানের ইট ব্যবহারের পাশাপাশি রাস্তার পাশে প্রয়োজনীয় মাটি দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
শাহীন বলেন, পুরোনো রাস্তার ওপর সামান্য খোয়া দিয়ে রোলার চালানোর পর কার্পেটিং করা হয়েছে। এতে সড়কটির স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
জনি বলেন, সড়কের নিচু অংশে বৃষ্টির পানি জমে থাকে। রাস্তা উঁচু করার অনুরোধ করা হলেও তাদের বলা হয়েছে, ‘বাজেট অনুযায়ী এখন এভাবেই কাজ হবে, পরে ভেঙে গেলে আবার করা হবে।
সাবু অভিযোগ করেন, নিম্নমানের ইট ব্যবহারের প্রতিবাদে এলাকাবাসী একপর্যায়ে কাজ বন্ধ করে দিয়েছিল। পরে প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় আবার কাজ শুরু হয়।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলায় তাদের সঙ্গে ঠিকাদারের দুর্ব্যবহার হয়েছে। প্রায় ৭০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা নির্মাণকাজের বিষয়ে জানতে চাইলে তাকে গালিগালাজ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারের তাৎক্ষণিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, এর আগেও COVID-19 প্রকল্পের আওতায় মোল্লাবাড়ির সামনের সড়ক, ফরিদা মসজিদ সড়ক, ভিআইপি রোড ও পিটিআই স্কুল রোডসহ বিভিন্ন রাস্তা, ড্রেন, স্ল্যাব ও ফুটপাত নির্মাণকাজে একই ব্যক্তি যুক্ত ছিলেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্পের তদারকি নিয়ে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের সিডিউল, নকশা, নির্মাণসামগ্রীর মান, কাজের পরিমাপ, এমবি, বিল-ভাউচার এবং প্রকৌশলীদের তদারকি প্রতিবেদন যাচাই করে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। একই সঙ্গে বাস্তবে কাজ পরিচালনাকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা যাচাইয়ের দাবিও জানিয়েছেন তারা।
বাগেরহাট পৌর প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন বলেন, “সড়ক উন্নয়নকাজগুলো তদারকি করা হচ্ছে। কোথাও রাস্তা ভেঙে গেলে ঠিকাদারের মাধ্যমে সংস্কারের ব্যবস্থা করা হবে। কোনো কাজে অনিয়ম পাওয়া গেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে স্থানীয়ভাবে ‘খোকন’ নামে পরিচিত ঠিকাদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সামনাসামনি বসে আলোচনা করতে চান এবং সাংবাদিকদের চা খাওয়ার দাওয়াত দেন। পরে অভিযোগের বিষয়ে জানতে ফোন করা হলে তিনি উত্তেজিত হয়ে সাংবাদিকদের ‘চাঁদাবাজ’ বলে মন্তব্য করেন এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে রাজি হননি।
স্থানীয়দের দাবি, কাজ শেষ হওয়ার আগেই অভিযোগগুলো তদন্ত করে অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তাদের আশঙ্কা, নিম্নমানের নির্মাণকাজের কারণে দ্রুত সড়ক নষ্ট হলে সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি ফের সংস্কারের ব্যয়ও জনগণের ওপর পড়বে।