. আশরাফ, আগৈলঝাড়া (বরিশাল) প্রতিনিধিঃ
বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে মনসা মঙ্গল কাব্যের রচয়িতা কবি বিজয় গুপ্ত প্রতিষ্ঠিত ৫৩৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী গৈলা মনসা দেবীর মন্দিরে হাজারো নারী-পুরুষ ভক্তের উপস্থিতিতে বার্ষিক মনসা পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
১৮ আগস্ট মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে পূজার্চনা শুরু হয়ে চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। হাজারো শিশু-নারী-পুরুষ ভক্ত তাদের মনস্কামনা পূরণ ও পুণ্য লাভের আশায় মানত পূজা দেন—দুধ, কলা, ফল, মিষ্টি, ধূপ, ধুনো, ছাগ বলিদান ও যজ্ঞ সম্পন্ন করেন। এ সময় আগত ভক্তদের মধ্যে মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হয়।
জগদ্বিখ্যাত কবি বিজয় গুপ্তের স্মৃতিরক্ষা মনসা মন্দির সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কমিটির সভাপতি ড. বিনয় ভূষণ রায় জানান, পূজার আগের দিন থেকেই দেশি-বিদেশি ভক্তরা মন্দির প্রাঙ্গণে সমবেত হতে শুরু করেন। পূজার আগে মন্দির চত্বরে তিন দিনব্যাপী রয়ানী গান অনুষ্ঠিত হয়—যেখানে ছন্দ ও সুরের মূর্চ্ছনায় দেবী মনসার পৃথিবীতে চাঁদ সওদাগরের হাতে পূজা পাওয়ার কাহিনী বর্ণনা করা হয়।
সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্নে পূজা সম্পন্ন করতে মন্দির কমিটি ও থানা পুলিশের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। শত দোকানির পসরা সাজানো বেচাকেনায় মন্দির প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকা মেলায় রূপ নেয়। আগত ভক্ত ও দর্শনার্থীরা তাদের প্রয়োজনীয় পূজার উপকরণসহ ঘরগৃহস্থলির কাজে ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন জিনিসপত্র কেনাকাটা করেন।
মনসা পূজা উপলক্ষে বরিশাল-১ আসনের সাংসদ ও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন সবাইকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন—উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিরুপম মজুমদার, আগৈলঝাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাসুদ খান, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্ট নির্বাহী কমিটির মহাসচিব সঞ্জয় গুপ্ত, উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মোল্লা বশির আহম্মেদ পান্না, মনসা মন্দির সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কমিটির সভাপতি ড. বিনয় ভূষণ রায়, সাধারণ সম্পাদক ডা. দীলিপ কুমার দাস, মন্দির কমিটির সাবেক সভাপতি তারক চন্দ্র দে ও হাজারো ভক্ত।
মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডা. দিলীপ কুমার দাস জানান, ৫৩৩ বছর আগে মধ্য যুগে সুলতান হোসেন শাহের রাজত্বকালে ১৪৯৪ সালে কবি বিজয় গুপ্ত সাপের দেবী মনসা বা বিষ হরি (বিষহরণকারী) দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে নিজ বাড়ির সুবিশাল দিঘি থেকে পূজার ঘট তুলে গৈলা গ্রামের নিজ বাড়িতে দেবী মনসার মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। পরে দেবী মনসার স্বপ্নাদেশে পাশ্ববর্তী বকুল গাছের নিচে বসে তিনি ‘পদ্মপুরাণ’ বা ‘মনসা মঙ্গল’ কাব্য রচনা করেন। সেই থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশসহ সর্বত্র পঞ্জিকা অনুযায়ী শ্রাবণ মাসের শেষ দিনে দেবী মনসা পূজার প্রচলনের সাথে সাথে গৈলা মনসা মন্দিরে দেবী মনসার নিত্য পূজার্চনা ও বার্ষিক পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। মনসা মঙ্গল কাব্য বাংলা সাহিত্যে অমর কাব্য হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।