
রশিতে বাঁধা দুটি কুকুর। এরপর লাঠির আঘাত, একের পর এক। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন অনেকে। প্রথম সারিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে রিপোর্ট হয়। ঘটনাস্থল পটুয়াখালীর সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের বাদুরা বাজারসংলগ্ন খেজুরতলা এলাকা। অভিযোগে জানা যায়, এক অদ্ভুত নিষ্ঠুরতার গল্প—৬টি হাঁস কামড়ানোর অভিযোগ, ৩ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণের বিরোধ কুকুর মালিকের সাথে, আর তারই মাশুল গুনতে হলো দুটি পোষা কুকুরকে, প্রাণ দিয়ে।
প্রায় একই সময়ে সামনে আসে আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবুল কালাম আজাদ এর ফেসবুক পোস্টে মাধ্যমে। সিলেটে এক বেওয়ারিশ কুকুরের কামড়ে আহত হন এক নারী, আর তার জবাবে ক্ষুব্ধ জনতা পিটিয়ে মেরে ফেলে কুকুরটিকে। একটি ঘটনা পোষা কুকুরকে ঘিরে, অন্যটি বেওয়ারিশ কুকুরকে নিয়ে—তবু দুই ঘটনাই যেন একই আয়নায় প্রতিফলিত হয়, একই প্রশ্ন তুলে ধরে। মানুষ আর কুকুরের এই সংঘাতের টেকসই সমাধান বাস্তবতার নীরিক্ষে কোথায়?
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘অতিথির স্মৃতি’ গল্পের কথা মনে পড়ে এখানে। লেখকের সাথে পথের এক কুকুরের সখ্য গড়ে ওঠে, তাতে কোনো শর্ত নেই, নেই প্রতিদানের হিসাব—শুধু নিঃস্বার্থ এক ভালোবাসা, যা মানুষ আর কুকুরের সম্পর্ককে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যায়। সেই সাহিত্যিক বাস্তবতার পাশে পটুয়াখালী কিংবা সিলেটের ঘটনা রাখলে বোঝা যায়, আমরা কতটা দূরে সরে এসেছি। যে প্রাণী মনিবের প্রতি আজীবন আনুগত্য আর ভালোবাসা বয়ে বেড়ায়, তারই ভাগ্যে আজ জোটে রশি আর লাঠি।
এক সময় বাংলাদেশের সিটি করপোরেশনগুলো পথকুকুর নিধনকেই নীতি হিসেবে মেনে নিয়েছিল। উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পর সেই পথ থেকে সরে আসতে হয়, আর জন্ম নেয় নতুন কৌশল—ক্যাচ-নিউটার-ভ্যাকসিনেট-রিলিজ, সংক্ষেপে সিএনভিআর। এই পদ্ধতিতে পথকুকুর ধরে বন্ধ্যাকরণ ও জলাতঙ্কের টিকা দিয়ে আবার তাদের নিজ এলাকায় ছেড়ে দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই কথা বলে—পথকুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কার্যকর ও মানবিক পথ বলে বিবেচিত।
জনস্বাস্থ্যের বিচারেও বিষয়টি হালকা করে দেখার জো নেই। বহু বছর ধরে জাতীয় জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় সরকার একদিকে মানুষের জন্য টিকা ও চিকিৎসাসেবা, অন্যদিকে পথকুকুরের টিকাদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রাজধানীর তুলনায় জেলা-উপজেলা পর্যায়ে এই কর্মসূচির নাগাল এখনো সংকীর্ণ। আর সেই ঘাটতির ফাঁক গলেই বেড়ে চলে কুকুরের সংখ্যা, কমে টিকাদানের হার, বাড়ে মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠা।
আইনের ভাষা অবশ্য স্পষ্ট। প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ অনুযায়ী প্রাণীর প্রতি অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুরতা শাস্তিযোগ্য অপরাধ, আর আদালতের নির্দেশনায় নির্বিচার পথকুকুর নিধনও নিরুৎসাহিত। তবু জননিরাপত্তার প্রশ্ন উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হাতে আইনসম্মত ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এক অর্থে আইন যেন দুই দিকেই তাকিয়ে থাকে—একদিকে প্রাণীর সুরক্ষা, অন্যদিকে মানুষের নিরাপত্তা।
তবে বাস্তবতা বলে, সমস্যার শিকড় কুকুরে নয়—দুর্বল ব্যবস্থাপনায়। অধিকাংশ পৌরসভা আর ইউনিয়নে নিয়মিত সিএনভিআর কর্মসূচির অস্তিত্বই নেই, জলাতঙ্কবিরোধী টিকাদানও যথেষ্ট ফলপ্রসূ নয়। ফলাফল দুই রকম—কোথাও কুকুরের কামড়ে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ওঠে, আবার কোথাও সেই আতঙ্ক আর ক্ষোভ গিয়ে আছড়ে পড়ে নিরীহ প্রাণীর ওপর।
এই জটিলতা থেকে বেরোনোর এখনই সময়। প্রথমত, দেশজুড়ে নিয়মিত সিএনভিআর ও জলাতঙ্ক প্রতিরোধ কর্মসূচি চালু রাখা। দ্বিতীয়ত, কুকুরের কামড়ের ঘটনা ঘটলে দ্রুত চিকিৎসা, টিকা ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, প্রাণিকল্যাণ আইনের কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা তৈরি করা, যাতে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়।
পটুয়াখালী কিংবা সিলেট—কোনোটিই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো আসলে আমাদের প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা, জনস্বাস্থ্যের চ্যালেঞ্জ আর প্রাণিকল্যাণের ঘাটতিরই প্রতিফলন। মানুষ ও কুকুরকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে নয়, বরং বৈজ্ঞানিক, মানবিক ও আইনসম্মত ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়েই এই সংঘাতের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
লেখকঃ মোঃ রিয়াজুল ইসলাম,
শিক্ষক ও গবেষক।