
জামায়াতের এক এমপির বহিষ্কারের ঘটনা আবারও আমাদের সামনে পুরনো এক প্রশ্ন নিয়ে হাজির হয়েছে—ক্ষমতা কি মানুষকে বদলে দেয়, নাকি ক্ষমতা কেবল উন্মোচন করে দেয় মানুষের ভেতরে চেপে থাকা আসল রূপটিকে?
মানুষের পতন কখনো এক রাতে ঘটে না। প্রথমে ভাঙে ভেতরের দেয়াল, তারপর একদিন হুড়মুড় করে ধসে পড়ে বাইরের চাকচিক্য। আব্রাহাম লিংকনের একটি বিখ্যাত উক্তি এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক—প্রায় সব মানুষই দুর্দিন সামলাতে পারে, কিন্তু কারও চরিত্র যাচাই করতে চাইলে তার হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে হয়।
ক্ষমতা আসলে মানুষকে বড় করে না; বরং তার ভেতরের প্রকৃত সত্তাকে প্রকাশ করে দেয়। পদ, প্রতিপত্তি বা জনপ্রিয়তা কখনোই চরিত্রের বিকল্প হতে পারে না। বরং বাস্তবতা হলো—যত উঁচুতে ওঠা যায়, পতনের শব্দ তত গভীর ও তীব্র হয়।
রাজনীতি যখন ছিল আদর্শের পাঠশালাঃ
এক সময় রাজনীতি ছিল আদর্শ শেখার জায়গা। মানুষ তার নেতার কাছে শুধু রাস্তাঘাট বা উন্নয়ন চাইত না, চাইত দৃঢ় ব্যক্তিত্ব, সংযম আর সততার দৃষ্টান্ত। আজও এই প্রত্যাশা বদলায়নি—বদলেছে শুধু বিস্মিত হওয়ার আমাদের সামর্থ্য। যে খবর একসময় গোটা জাতিকে স্তব্ধ করে দিত, আজ তা কয়েক দিনের আলোচনার পরই হারিয়ে যায় নতুন কোনো ঘটনার ভিড়ে।
নৈতিকতাকে ধর্ম দেখে ইবাদতের অলংকার হিসেবে, দর্শন দেখে বিবেকের শাসন হিসেবে, আর রাষ্ট্রবিজ্ঞান দেখে জনআস্থার ভিত্তি হিসেবে। যে সমাজে নৈতিকতা দুর্বল হয়ে পড়ে, সেখানে আইন কঠোর হতে পারে, কিন্তু শান্তি নিশ্চিত হয় না—কারণ আইন মানুষের হাত বাঁধতে পারে, বিবেক নয়।
নিজের দিকে ফিরে তাকানোর সময়ঃ
আমরা প্রায়ই অন্যের পতনের গল্প পড়ি, আলোচনা করি, বিচারও করি। কিন্তু নিজের দিকে তাকানোর সময় খুব কমই পাই। প্রতিটি বড় কেলেঙ্কারির পেছনে আসলে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য ছোট ছোট নীরব আপস—সত্যের সঙ্গে, নীতির সঙ্গে, বিবেকের সঙ্গে। একদিন এই আপসই প্রথমে গ্রাস করে ব্যক্তিকে, তারপর প্রতিষ্ঠানকে, শেষে গোটা সমাজকে।
আজকের প্রশ্নটি তাই কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলকে ঘিরে নয়। প্রশ্নটি হলো—আমরা কেমন সমাজ গড়ে তুলছি? এমন একটি সমাজ, যেখানে সম্মান অর্জনের চেয়ে আলোচনায় থাকাটাই বড় হয়ে উঠছে? নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে চরিত্র এখনো পরিচয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশ হয়ে টিকে আছে?
যা টিকে থাকে, তা ক্ষমতা নয়ঃ
ইতিহাসের পাতায় ক্ষমতাবানদের নাম অসংখ্য লেখা আছে। কিন্তু সময় শেষ পর্যন্ত মনে রাখে তাঁদেরই, যাঁরা ক্ষমতার চেয়ে চরিত্রকে বড় করে দেখেছিলেন। কারণ ক্ষমতার একটি মেয়াদ থাকে, কিন্তু চরিত্রের থাকে উত্তরাধিকার।
শেষ পর্যন্ত একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার পদ নয়, সম্পদ নয়, অনুসারীর সংখ্যাও নয়। বরং সেটি হলো—তিনি একা থাকলেও নিজের বিবেকের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেন কি না।
একজন প্রকৃত নেতা কেবল নির্বাচনে জেতেন না, তিনি জয় করেন মানুষের আস্থা। তাঁর শক্তির উৎস পদ নয়, চরিত্র। তিনি ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত সুবিধার সিঁড়ি নয়, বরং জনকল্যাণের দায়িত্ব হিসেবে দেখেন। আইনের ঊর্ধ্বে নন তিনি, বরং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। দুর্বলকে তিনি আশ্রয় দেন, শোষণ করেন না; সুযোগ তৈরি করেন, বিনিময়ে আনুগত্য দাবি করেন না; সমালোচনাকে দেখেন শত্রুতা নয়, বরং আত্মসমালোচনার আয়না হিসেবে।
নেতৃত্বের প্রকৃত মহিমা তখনই প্রকাশ পায়, যখন মানুষ কাউকে অনুসরণ করে ভয় থেকে নয়, শ্রদ্ধা থেকে। ইতিহাস সেই নেতাদেরই মনে রাখে না যাঁদের হাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা ছিল, বরং মনে রাখে তাঁদের—যাঁদের চরিত্র সবচেয়ে বেশি মানুষের আস্থা অর্জন করতে পেরেছিল।
রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতি—সবকিছুর ভিত্তি শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়ায় একটি শব্দে: বিশ্বাস। আর এই বিশ্বাসের শিকড় কখনোই ক্ষমতায় প্রোথিত নয়; তা প্রোথিত থাকে সততা, ন্যায়বোধ, আত্মসংযম আর জবাবদিহিতার মাটিতে।
মোঃ রিয়াজুল ইসলাম,
শিক্ষক ও গবেষক।