
একটি নির্ভুল পূর্বাভাস কখনো কখনো হাজার হাজার প্রাণ বাঁচিয়ে দেয়। কয়েক ঘণ্টা আগে জানা গেলে উপকূলের মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে পারেন, জেলেরা নিরাপদে ফেরেন, কৃষক ফসল বাঁচান, প্রশাসন আগাম প্রস্তুতি নেয়। একটি আধুনিক আবহাওয়া ব্যবস্থা কেবল তথ্য দেয় না—জীবন বাঁচায়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, দুর্যোগপ্রবণ এই দেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর এখনও অনেকাংশে কয়েক দশক আগের প্রযুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে। অধিকাংশ ডপলার রাডার অচল, বজ্রপাত শনাক্তকারী সেন্সরের বড় অংশ বিকল, নিজস্ব আবহাওয়া উপগ্রহ নেই, নেই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সুপারকম্পিউটার, প্রশিক্ষিত জনবলও অপ্রতুল। ফলে আধুনিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের বদলে ভরসা করতে হয় বিদেশি সংস্থার তথ্য আর সীমিত অবকাঠামোর ওপর। এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা নয়—রাষ্ট্রের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার একটি বড় ঝুঁকি।
বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা বাড়ছে, বৃষ্টিপাতের ধরন অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়ছে। আগে যে পরিবর্তন ঘটত কয়েক দিনে, এখন তা ঘটে যায় কয়েক ঘণ্টায়। এই বাস্তবতায় পুরোনো অ্যানালগ প্রযুক্তি দিয়ে আধুনিক দুর্যোগ মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সুপারকম্পিউটার, রিয়েল-টাইম স্যাটেলাইট তথ্য ও স্বয়ংক্রিয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সমন্বিত ব্যবহার।
জাপান পৃথিবীর অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ, তবুও সেখানে দুর্যোগ মোকাবিলা এত কার্যকর কেন? কারণ জাপান আবহাওয়া সংস্থা (JMA)-র নিজস্ব উপগ্রহ, শতাধিক আধুনিক রাডার, সুপারকম্পিউটার আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা কয়েক মিনিটেই সারা দেশে সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে পারে—মোবাইল, টিভি, রেডিও, সাইরেন, সবকিছু একযোগে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
যুক্তরাষ্ট্রের NOAA আর National Weather Service শত শত রাডার আর একাধিক উপগ্রহের মাধ্যমে কয়েক দিন আগেই ঝড়ের গতিপথ বলে দিতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স—সবাই একই পথে হেঁটেছে। তাদের কাছে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ নিছক একটি সরকারি দপ্তরের কাজ নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা জানে, দুর্যোগের আগে সতর্কতা দেওয়া পরের পুনর্গঠনের চেয়ে ঢের কম ব্যয়বহুল।
আজকের আবহাওয়া পূর্বাভাস মূলত দাঁড়িয়ে আছে তিনটি ভিত্তির ওপর—উপগ্রহ, ডপলার রাডার আর সুপারকম্পিউটার। স্যাটেলাইট মহাকাশ থেকে মেঘ, ঘূর্ণিঝড় আর সমুদ্রের তাপমাত্রা দেখে; রাডার স্থানীয়ভাবে বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি আর ঝড়ের গতিপথ ধরে; সুপারকম্পিউটার প্রতি সেকেন্ডে কোটি কোটি তথ্য বিশ্লেষণ করে মডেল তৈরি করে। বাংলাদেশে এই তিনটির কোনোটিই আন্তর্জাতিক মানে গড়ে ওঠেনি—ফলে পূর্বাভাসে দেরি হয়, নির্ভুলতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
শুধু যন্ত্র কিনলেই সমাধান হবে না। প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের আবহাওয়াবিদ, প্রকৌশলী, তথ্যবিশ্লেষক আর গবেষক। এখন অনেক পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র চলছে মাত্র এক-দুজন কর্মকর্তা দিয়ে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, বিদেশে উচ্চশিক্ষা আর বিশ্ববিদ্যালয়ে আবহাওয়াবিজ্ঞান চর্চার সম্প্রসারণ ছাড়া এই ঘাটতি পূরণ হবে না।
কৃষকের বীজ বপন থেকে ফসল কাটা, জেলের সমুদ্রযাত্রা, বিমান চলাচল, নৌপরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, এমনকি নগর ব্যবস্থাপনা—সবকিছুই এখন আবহাওয়া তথ্যনির্ভর। একটি বিলম্বিত সতর্কবার্তা শত শত প্রাণহানির কারণ হতে পারে। উন্নত বিশ্বে তাই কৃষকের জন্য আলাদা কৃষি-আবহাওয়া সেবা, মৎস্যজীবীর জন্য সমুদ্র পূর্বাভাস, বিমান চলাচলের জন্য বিশেষায়িত তথ্য দেওয়া হয়। এই সেবাগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে তোলা এখন সময়ের দাবি।
অনেকের ধারণা, আবহাওয়া ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বাস্তবতা উল্টো। একটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় বা আকস্মিক বন্যা কয়েক ঘণ্টায় হাজার কোটি টাকার ক্ষতি করে দিতে পারে। বিপরীতে আধুনিক রাডার, স্যাটেলাইট তথ্যপ্রযুক্তি আর বজ্রপাত শনাক্তকরণ নেটওয়ার্ক গড়তে যে বিনিয়োগ লাগে, তা দীর্ঘমেয়াদে বহুগুণ অর্থ বাঁচায়। এটি তাই ব্যয় নয়—মানুষের জীবন আর জাতীয় অর্থনীতি রক্ষার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে কাজ হবে না, দরকার দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা। অচল রাডারগুলো সচল করতে হবে, পর্যায়ক্রমে বসাতে হবে আধুনিক এস-ব্যান্ড ও সি-ব্যান্ড রাডার। বজ্রপাত শনাক্তকারী সেন্সর আর স্বয়ংক্রিয় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ছড়িয়ে দিতে হবে সারা দেশে। প্রতিষ্ঠা করতে হবে নিজস্ব সুপারকম্পিউটার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পূর্বাভাস মডেল, ক্লাউডভিত্তিক ডেটা সেন্টার আর সমুদ্র পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি।
কিন্তু প্রযুক্তি কেনা সহজ, ধরে রাখা কঠিন। বহু প্রকল্পে দেখা গেছে, কোটি টাকার যন্ত্র কিনেও রক্ষণাবেক্ষণ আর দক্ষ জনবলের অভাবে তা অচল হয়ে পড়েছে। এই ভুলের পুনরাবৃত্তি আবহাওয়া অধিদপ্তরের ক্ষেত্রে ঘটতে দেওয়া যাবে না। প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার, স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, নিয়মিত সংস্কার আর মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়—কারণ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের একার কাজ নয়।
একটি রাষ্ট্রের দূরদর্শিতা বোঝা যায় সে কত দ্রুত দুর্যোগের খবর পায় আর কতটা দক্ষতায় জনগণকে নিরাপদ রাখে। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে ঘূর্ণিঝড়ের আগেই উপকূলবাসীর মোবাইলে সতর্কবার্তা পৌঁছে যাবে, কৃষক বৃষ্টির সময় জেনে ফসল বাঁচাবেন, জেলে নিরাপদে সমুদ্রে যাবেন, বজ্রপাতের আগেই মানুষ আশ্রয় নেবেন।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিছক একটি সংবাদ নয়—এটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষার অঙ্গীকার। একটি সচল রাডার, একটি কার্যকর স্যাটেলাইট, একজন দক্ষ আবহাওয়াবিদের মূল্য টাকা দিয়ে মাপা যায় না। জলবায়ু পরিবর্তনের এই অস্থির সময়ে আর দেরি করার সুযোগ নেই। পঙ্গু নয়—প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ ও বিশ্বমানের একটি আবহাওয়া অধিদপ্তর গড়ে তোলার এখনই সময়।
লেখক: জুবাইয়া বিন্তে কবির, অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট