সঞ্জীব দাস, গলাচিপা (পটুয়াখালী)||
"টাহা পাইলে খাই, না পাইলে খাই না।"
এক কলস পানি টেনে দিয়ে পেয়ে যান পাঁচ টাকা। সেই টাকায় এক বেলার খাবার। না পেলে দিনটা কাটে উপোসেই। চোখে ক্লান্তির ছায়া, মুখে অনুচ্চারিত এক যুদ্ধের গল্প। বয়স ৫৬, নাম জাফর। গলাচিপা উপজেলার আমখোলা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে মানুষের দয়ার আশ্রয়ে বেঁচে আছেন।
জীবনে নেই নিজের ঘর, জমি, স্ত্রী কিংবা সন্তানের স্নেহ। একসময় দিনমজুরির কাজ করতেন, কিন্তু বয়সের ভারে আর পারেন না। আজ শুধু পানির কলসি বয়ে দোকানে দোকানে দিয়ে কোনও মতে টিকিয়ে রেখেছেন জীবন। প্রতিদিন ৮-১০ কিলোমিটার হেঁটে গলাচিপা বাজারে আসেন তিনি। প্রতিটি কলসের জন্য পান ৫ টাকা। দিনে সর্বোচ্চ আয় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা—যার পুরোটাই চলে যায় খাবারের পেছনে। দিন খারাপ গেলে শুধু পানি খেয়েই কাটে পুরো দিন।
স্ত্রী নেই, সন্তান নেই, শুধু আছে এক কলস পানি...
প্রায় ২০ বছর আগে স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেছেন। সন্তানও নেই। আত্মীয় বলতে পটুয়াখালী সদর উপজেলার দক্ষিণ বাদুরার একমাত্র ভাই, যিনি আবার বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। সেই অভাব-অনটনের ঘর ছেড়ে ২৭ বছর আগে আশ্রয় নেন আমখোলায় এক অচেনা মানুষের বাড়িতে।
স্থানীয় দোকানি সাইফুল ইসলাম বলেন, “জাফর ভাই প্রতিদিনই আসে। সহজ-সরল মানুষ। অনেক সময় অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকে, কিন্তু চিকিৎসার খরচ নেই। আমরা ওকে কিছু টাকা দিই, এভাবেই চলছে তার জীবন।”
এনআইডি নেই, অধিকারও নেই
জাফরের নেই জাতীয় পরিচয়পত্র। ফলে বয়স্কভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, ভিজিএফ, চিকিৎসা সহায়তা—সবই তার জন্য স্বপ্নের মতো। স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. শাহআলম জানান, “জাফর খুব সহজ-সরল প্রকৃতির মানুষ। ব্যক্তিগতভাবে চিনি তাকে। আমি খোঁজ নিয়ে দেখব সে কোনো সহায়তা পায় কি না।”
স্থানীয়রা বলছেন, জাফর আদতে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। কখনো ঝগড়া করেন না, কিছু চাওয়ার সাহসও করেন না। নিজের প্রাপ্যটুকু বোঝেন না, চাইতেও জানেন না।
পাঁচ টাকার কলস, হাজার টাকার ক্লান্তি
জাফরের জীবনের গল্প শুনে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে লজ্জার জায়গা আছে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য। যেখানে দিনের পর দিন এক মানুষ শুধু পাঁচ টাকার বিনিময়ে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বয়ে চলেছেন পানি, সেখানে তার জীবনের ন্যূনতম নিরাপত্তা না থাকাটাই বড় ব্যর্থতা।
প্রশাসনের কাছে স্থানীয়দের দাবি, যেন অবিলম্বে জাফরের এনআইডি তৈরি করে প্রয়োজনীয় সরকারি-বেসরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা হয়। যেন এই মানুষগুলো করুণা নয়, অধিকার হিসেবেই পায় জীবন রক্ষার উপকরণ।
জাফর জানেন না, আগামীকাল খেতে পারবেন কি না। তবে তিনি জানেন, এক কলস পানি এখনো বয়ে নিয়ে যেতে পারবেন—যদি কেউ পাঁচ টাকা দেন।
এটাই এই দেশের অজস্র জাফরের জীবন। তাদের কাছে রুটি-কলা মানেই রাজ্যজয়।