তারিকুল তাজ, কক্সবাজার||
দুপুরের রোদ মাথায় নিয়ে গতকাল উখিয়ার প্রধান সড়কে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন শামীম হোসেন। কণ্ঠে হতাশা, চোখে ক্ষোভ। বললেন, “রোহিঙ্গা শিক্ষকরা যদি পারেন, আমরা কেন পারব না? আমাদের চাকরি কাড়ল কেন?” তাঁর মতো আরও ১২৫০ জন স্থানীয় শিক্ষক একযোগে চাকরিচ্যুত হয়েছেন। এনজিওর স্কুলে কাজ করতেন তাঁরা। ছাঁটাইয়ের কারণ—‘অর্থ সংকট’। কিন্তু একই প্রতিষ্ঠানে থাকা রোহিঙ্গা শিক্ষকরা বহাল। সেখানেই উঠছে প্রশ্ন—এ বৈষম্য কেন?
উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বহু বছর ধরেই এনজিওগুলোর পরিচালিত স্কুলে রোহিঙ্গা শিশুদের পড়ান স্থানীয় ও রোহিঙ্গা শিক্ষকরা। কিন্তু গত শুক্রবার হঠাৎ করেই ব্র্যাক, কোডেক, ফ্রেন্ডশিপ, মুক্তি, কোস্ট ফাউন্ডেশন ও জেসিএফসহ একাধিক সংস্থা স্থানীয় শিক্ষকদের একযোগে ছাঁটাই করে। কোনও পূর্ব সতর্কতা ছিল না, ছিল না বিকল্প চাকরির আশ্বাস।
পরদিন শনিবার সকাল থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকা। বিক্ষোভে সামিল হয় চাকরিচ্যুত শিক্ষকরা। হুঁশিয়ারি দেন—“চাকরি ফিরিয়ে না দিলে আজ রবিবার থেকে ক্যাম্পে কোনও এনজিও গাড়ি প্রবেশ করতে পারবে না।”
স্থানীয় প্রশাসন তৎপর হয়ে পড়ে। উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম চৌধুরী জানালেন, ইউনিসেফের অর্থায়নে চলা এই শিক্ষা প্রকল্পে অর্থসঙ্কট দেখা দেওয়ায় ছাঁটাই শুরু হয়েছে। “আমাদের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, ৩০ জুন পর্যন্ত প্রকল্প চালানোর মতো অর্থ রয়েছে। তার মধ্যেই ধাপে ধাপে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়া হবে।”
এই ছাঁটাইয়ের ঢেউ এখানেই থামছে না। বিক্ষোভকারীদের দাবি, আরও প্রায় তিন হাজার স্থানীয় শিক্ষক ঝুঁকিতে আছেন। তাঁরা আতঙ্কে দিন গুনছেন।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, প্রকল্প বন্ধের সিদ্ধান্ত দাতাদের। “আমরা জানি, এ সিদ্ধান্ত কঠিন। কিন্তু অর্থ না থাকলে অনেক কিছুই করা সম্ভব নয়।”
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—সংকট যদি থাকে, তাহলে তা কি শুধু স্থানীয়দের উপরই এসে পড়ে? কেন রোহিঙ্গা শিক্ষকরা ছাঁটাইয়ের তালিকায় নেই?
উত্তর এখনও মেলেনি। ততক্ষণে উখিয়ার গাঁ-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষোভ। অনেকেই বলছেন, “শুধু রোহিঙ্গাদেরই সুযোগ সুবিধা দিলে, স্থানীয়রা কোথায় যাবে?”
রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক সহায়তা নিয়ে দেশের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই চাপা অসন্তোষ ছিল। এবার সেই অসন্তোষ শিক্ষিত ও কর্মজীবী তরুণদের মধ্যে বিস্ফোরণের রূপ নিচ্ছে।