সাউথ বাংলা | ফিচার
একটি গ্রাম, গাছের ছায়ায় বা কাচারি ঘরে কিছু পুরনো চেয়ারে বসে থাকা কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ। কেউ পান চিবোচ্ছে, কেউ হাতে তসবি ঘুরাচ্ছে। পরকালের কথা মাথায় রেখে পোক্ত ঈমানিতে বিচার কাজ হতো শুরু।
গ্রামীণ সমাজে এই সালিশ ব্যবস্থাই একসময় ছিল গ্রাম্য ন্যায়বিচারের মূল স্তম্ভ, গ্রাম্য আদালত। মানুষ আসতো, শুনতো, রায় মেনে নিতো। এড়ানো যেত কোর্ট প্রাঙ্গণের অহেতুক হয়রানি। কিন্তু সময় বদলেছে, মুখ বদলালেও বদলায়নি মানসিকতা। এখন সালিশের টেবিলগুলো অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে গেছে এক ধরনের “ক্ষমতা প্রদর্শনের জায়গা”।
সামনে দুই পক্ষ দাঁড়িয়ে—কারো চোখ মাটিতে, কেউ রাগে উত্তাল। শুরু হলো সালিশ। প্রশ্ন উঠল জমির সীমানা নিয়ে, কিন্তু আলোচনা ঘুরে গেল ‘কে আগে হজ করেছে’, ‘কার ছেলেটা কী চাকরি পায়’, ‘কে এলাকার কত বড় দানশীল’, 'কোন জায়গায় একটা বড়ো তাল গাছ ছিল'—এ যেন সমস্যার সমাধান নয়, বরং এক ধরণের ব্যক্তিগত প্রচার আর ফালতু জাহির এটাও হতো তখন।
গ্রামের অসংখ্য মানুষ এমন সালিশে জীবন কাটাচ্ছেন, যেখানে সত্য-মিথ্যার বিচার নয়, বরং কার সঙ্গে সালিশকারীর সম্পর্ক ভালো, সেটাই হয়ে উঠছে মূল ফ্যাক্টর। শোনা যায়, “ও তো আমার ভাইপো, একটু ছাড় দিয়ে দাও।” আবার কেউ বলেন, “এই ছেলেটা শহরের চাকরিজীবী, চোখে অহংকার।” তার দোষটা কী, সেটি যেন কেউ দেখতে চায় না।
কিন্তু আজ যাঁরা সালিশের নেতৃত্বে থাকেন, তাঁদের অনেকের পোশাকে আছে ধর্মের ছাপ— কিন্তু এই ধর্মীয় কর্ম প্রতিফলিত হয় কী সালিশে?
দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক সালিশই ঘুষ, পক্ষপাত, বা আত্মীয় স্বজনের পক্ষে রায় দেওয়ার মাধ্যমে আরেক পক্ষকে চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলে। কেউ কেউ আবার এমন ভাবে সালিশ করেন যেন সমস্যাটা পুরোপুরি না মেটে—যাতে আবারও তাদের প্রয়োজন হয়, আবারও কিছু খাওন-দাওনের ব্যবস্থা হয়। এটাও যেন এক ধরণের ‘গ্রাম্য রাজনীতি’।
আর সবচেয়ে বড় সমস্যার জায়গা হলো, এই সালিশে শিক্ষিত, তরুণদের জন্য জায়গা খুবই কম। বরং তাদের উপহাস করে বলা হয়—“তোমার দাড়ি কই?” বা “তোমার কথার তো গন্ধ নাই, তুমি ছোট মানুষ, এর বুঝবা কী?!”
এভাবে সালিশে যারা বসেন, তাদের কথাবার্তায় নেই সহানুভূতি, নেই ধৈর্য ধরতে শেখানোর চেষ্টা। বরং এক ধরণের আগ্রাসী মনোভাব, ইগো আর ‘আমিই সব জানি’ টাইপ আচরণ চলে। সলিশে আসা অনেকে পক্ষ হয়ে নিজেরাও মাঝে মাঝে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। ফলে দুই পক্ষের সমস্যা আরও বাড়ে, মীমাংসা দূরের কথা।
তবে সবই কি অন্ধকার? না। কিছু জায়গায় নতুন প্রজন্ম, স্থানীয় প্রশাসন এবং সচেতন ধর্মীয় নেতারা মিলে চাচ্ছেন এই ব্যবস্থার সংস্কার। তাঁরা চান, সালিশ হোক মানবিক, যুক্তিনির্ভর এবং ধর্মের মূল আদর্শ—ন্যায় ও সহমর্মিতার—ভিত্তিতে পরিচালিত।
আজও, গ্রামে যাদের শেষ আশ্রয় সালিশ, তাদের জন্য যদি একে সত্যিকারের ন্যায়ের পদ্ধতি হিসেবে ফিরিয়ে না আনা যায়, তবে একদিন এই ব্যবস্থার নামে শুধুমাত্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের আগুন জ্বলবে। সালিশ আর থাকবে না ন্যায়ের প্রতীক, হয়ে উঠবে বিরোধ, ক্ষোভ এবং বিভাজনের জায়গা।
একদিন, হয়তো গ্রাম বাংলার মেঠোপথে শোনা যাবে এই কথাটি—‘সালিশ মানেই হয়রানি, ন্যায় নয়’।
এটা আমাদের না চাইলে, আস্তে আস্তে সমাজের প্রতিটি স্তরে গভীরভাবে শিকড় গেড়ে বসবে। এখনই সময় সেই ঐতিহ্যবাহী সালিশ ব্যবস্থাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার, যেখানে থাকবে সত্যিকারের ন্যায়, মানবিকতা এবং শ্রদ্ধাবোধ—যাতে গ্রামবাংলা সত্যিকার অর্থে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারে।
লেখক: মোঃ রিয়াজুল ইসলাম, শিক্ষক।